চতুর্থ প্রজন্মের অন্যতম বড় নেটওয়ার্কের ব্যাংক এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর স্বাধীন পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সুশাসনের ঘাটতি, নীতিনির্ধারণে স্বেচ্ছাচারিতা এবং ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অনিয়ম, ভুল সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অবনতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) কাঠামোর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটির ঋণ পোর্টফোলিও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একই সঙ্গে গত ছয় মাসে নিট সুদ আয় (এনআইএম) ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগজনকভাবে ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি আগের বছরের তুলনায় আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা ও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির জন্য কার্যকর কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর অভিযোগ
ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে বড় অঙ্কের বিভিন্ন পেমেন্ট বা বিল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, খাতা-কলমে কৃত্রিমভাবে মুনাফা বা তুলনামূলক ভালো আর্থিক ফলাফল দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে আর্থিক চিত্র ভালো দেখালেও ভবিষ্যতে ব্যাংকটি আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত আধুনিক প্রযুক্তি, লজিস্টিক সুবিধা ও সেবার ঘাটতির কারণে গ্রাহকরাও কাঙ্ক্ষিত ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে গ্রাহকদের একটি বড় অংশ অন্য ব্যাংকের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ
ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী ও কৌশলগত কার্যক্রমের পরিবর্তে পর্ষদের একাংশ দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কার্যক্রমে স্থবিরতার মধ্যে তুলনামূলক জুনিয়র একজন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে (ডিএমডি) ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবস্থাপনার চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পুরোনো কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নতুন কর্মকর্তাদের মধ্যেও পেশাগত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে অনেকে চাকরি ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক অডিট অবজারভেশন নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি বোর্ড সভায় এমডির অনুপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ব্যাংকের সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার নানা ঘাটতি তুলে ধরেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পর্ষদের কিছু সদস্য দায় স্বীকার না করে উল্টো ব্যাংকের একজন সিনিয়র ডিএমডির ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিষয়টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এ ছাড়া ধারাবাহিক এসব অভিযোগের মধ্যে চেয়ারম্যানের পরামর্শে ব্যাংকের এমডি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফরেনসিক অডিট নিয়েও প্রশ্ন
কেপিএমজির মাধ্যমে পরিচালিত ফরেনসিক অডিট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অডিটের জন্য সুনির্দিষ্ট টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না। পাশাপাশি অডিট প্রতিবেদনে কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক সুপারিশের ঘাটতি থাকায় ব্যাংকের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কারে এর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।
এ কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত ওই অডিটের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, এর নেতিবাচক প্রভাবে ব্যাংকের উন্নয়ন ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাঁচ শতাধিক পুরোনো কর্মীকে জবাবদিহির নামে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অথচ ব্যাংকের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষায় দক্ষ ও নিরপেক্ষ অডিট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
কেপিএমজির অডিটের পরও ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং পরবর্তী সময়ে ক্রেডিট কার্ড এবং শাখা পর্যায়ে ক্যাশ হ্যান্ডলিংয়ে মিসম্যাচসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা আবারও সামনে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অভিযোগ করেছেন।
অবসরকালীন সুবিধা নিয়েও বৈষম্যের অভিযোগ
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি শেষে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা বা ‘এন্ড সার্ভিস বেনিফিট’ প্রদানের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত দুই মাসের সময়সীমার নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, পর্ষদের নির্দিষ্ট কোনো সদস্যের সুপারিশ কিংবা ওপর মহলের বিশেষ ফোনকল ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এ সুবিধার অর্থ ছাড় করা হয় না। এতে অবসরপ্রাপ্ত ও অবসরের অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
পর্ষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার না হয়েও পর্ষদের একাংশের ভূমিকা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা ও পর্ষদ সভার সম্মানিককেন্দ্রিক হয়ে পড়লে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং গ্রাহক আস্থা—সব ক্ষেত্রেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনে বিদ্যমান পর্ষদের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করে অভিজ্ঞ ও দক্ষ সদস্যদের সমন্বয়ে কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ খান কালবেলাকে বলেন, কোনো ব্যাংক একই সঙ্গে পিসিএ কাঠামোর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকলে, খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে এবং নিট সুদ আয় নেতিবাচক হয়ে পড়লে সেটিকে আর সাধারণ ব্যাংকিং দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ব্যাংকটির মৌলিক আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত।
তার মতে, এর সঙ্গে যদি পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ যুক্ত হয়, তাহলে আর্থিক ঝুঁকির পাশাপাশি সুশাসনসংক্রান্ত ঝুঁকিও তৈরি হয়। এর প্রভাব মূলধনের পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের আস্থার ওপর পড়তে পারে।
বিশেষ করে পর্ষদ যদি ঋণ অনুমোদন, পুনঃতপশিল কিংবা ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়া এবং সম্পদের মান অবনতির আশঙ্কা থাকে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এম হেলাল আহমেদ খান বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো খেলাপি ঋণ বাড়লে আয় কমে, প্রভিশনের চাপ বাড়ে এবং মূলধন দুর্বল হয়। অন্যদিকে সুশাসন দুর্বল হলে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তা আরও গভীর হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব শুধু শেয়ারহোল্ডারদের ওপর নয়, আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ওপরও পড়তে পারে।
তাই এ ধরনের ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধু তারল্য সহায়তা নয়; প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি নিরূপণ, খেলাপি ঋণ আদায়, প্রয়োজনীয় মূলধন পুনর্গঠন এবং পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
জবাব মেলেনি কর্তৃপক্ষের
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানীয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে জানা যায়, তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ফলে তার কাছ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালবেলাকে বলেন, পরিদর্শনের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া গেলে প্রতিটি বিষয়েই সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। কেন ওই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যবস্থা শুধু এনআরবিসি ব্যাংকের ক্ষেত্রে নয়, সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকরা নিয়মিতভাবে দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা পরিদর্শন ও তদন্ত করে দেখবে। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে স্বতন্ত্র পরিচালকরা পরিচালন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছেন এবং সেই হস্তক্ষেপ ব্যাংকের স্বার্থে নয়, ব্যক্তিস্বার্থে করা হচ্ছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের বোর্ডে থাকা উচিত কি না, সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।



