বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার নারীর মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর এই উচ্চ হার মূলত অসচেতনতা, লজ্জা বা ভয় থেকে রোগ গোপন রাখা এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার ফলেই হচ্ছে। তাই এই মরণব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আয়োজন করে বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরাম।
ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন জানান,
আগামী ৩০–৩১ অক্টোবর রাজশাহী ও খুলনা রুটে ‘গোলাপি সজ্জিত বাসে’ সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালিত হবে। এছাড়া ৮ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে ‘চতুর্থ সমাজভিত্তিক ক্যান্সার সম্মেলন’।
সম্মেলনে অংশ নিতে ৫০০, ৭০০ ও ১,০০০ টাকার রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে অনলাইন বা সরাসরি নিবন্ধন করা যাবে।
তিনি জানান, গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারের অপারেশন খরচ সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার টাকা, এবং অতিদরিদ্রদের জন্য এই খরচ মাত্র ৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন,
“রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও উন্নয়ন—এই তিনটি একসাথে কার্যকর না হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা সম্ভব নয়। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে শিক্ষার প্রসার এবং গণমাধ্যম ও কমিউনিটি ট্রেনিংয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।”
কমিশনের আরেক সদস্য অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন,
“কেউই ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে চায় না, তাই শুরুতেই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে তা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে দেরি করলে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।”
তিনি ক্যান্সার রোগীদের একটি জাতীয় ডাটাবেইজ বা রেজিস্ট্রি গঠনের ওপর জোর দিয়ে বলেন,
“দেশে এখনো কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতা। এটি গঠন করতে বেশি খরচ না হলেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মো আকরাম হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সারে প্রতি বছর ১৩ হাজার নারী আক্রান্ত হলেও প্রায় ৬ হাজার নারীর মৃত্যু হয়, যা বিশ্বে বিরল। কারণ, অনেক নারী রোগটি ধরা পড়ার পরও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে ৮–১০ শতাংশ টিউমার থাকতেই চিহ্নিত করা গেলে ভালোভাবে সুস্থ হওয়া সম্ভব।”
তিনি প্রতিটি নারীকে নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে বলেন,
“স্তন পরীক্ষা হাত দিয়ে নিজেই করা যায়। এটি নিয়মিত করলে আগেভাগে সন্দেহজনক পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।”
পাঠ্যপুস্তকে স্তন ক্যান্সার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন,
“শিক্ষা ব্যবস্থায় রোগ সম্পর্কে তথ্য থাকলে সচেতনতা বাড়ে। বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা জরুরি।”
নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হালিদা হানুম আক্তার বলেন,
“আমাদের সমাজে স্তন ক্যান্সার নিয়ে লজ্জা বা গোপন রাখার প্রবণতা রয়েছে। এটি নারীর দোষ নয়, বরং সচেতনতার অভাব। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হলে পরিবার, স্কুল ও কলেজ—সব জায়গায় তথ্য পৌঁছাতে হবে।”
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য মাশহুদা খাতুন শেফালী বলেন,
“সচেতনতা সৃষ্টি করা ব্যয়বহুল কাজ। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং যারা এ নিয়ে কাজ করছে, তাদের সহায়তা দিতে হবে।”
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সারিয়া তাসনিম বলেন,
“তরুণদের সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করলে এটি সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।”
অধ্যাপক মালিহা রশিদ স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের খরচ কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।



