tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়সৌদি আরবে চাকরি হারানোর শঙ্কায় সাড়ে ৮ হাজার প্রবাসী, ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা

সৌদি আরবে চাকরি হারানোর শঙ্কায় সাড়ে ৮ হাজার প্রবাসী, ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা

কুমিল্লার আবুল হাসানাত দুই বছর ধরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। গত আগস্টের শেষ দিকে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে তাঁর রিয়াদে ফেরার কথা ছিল। পরদিনই কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে ফিরতে পারেননি তিনি। এতে চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন এই প্রবাসী।

হাসানাতের মতো গতকাল সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদি আরবে যেতে পারেননি ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী। তাঁদের কেউ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন, কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। আবার কারও কাজের অনুমতি ও বসবাসের অনুমতির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি।

গতকাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের সামনে সৌদিগামী যাত্রী ও তাঁদের স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। ফ্লাইট বন্ধের খবর জানার পরও অনেকে বিমানবন্দর ছাড়তে চাননি। যদি কোনোভাবে ফ্লাইট ছেড়ে যায়, সেই আশায় লাগেজ-ব্যাগেজ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী ও তাঁদের স্বজনদের।

যাত্রীদের কেউ কেউ জানান, ফ্লাইট স্থগিত হলেও কবে আবার চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে অনেকে গ্রামের বাড়িতে না ফিরে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান করছেন। কেউ আবার ঢাকায় স্বজনদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।

সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর একের পর এক হামলার কারণে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট চলাচলে। গত শনিবার থেকে ঢাকা-রিয়াদ রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের দাম্মামগামী ফ্লাইট চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।

তিন দিনে স্থগিত ৬১ ফ্লাইট

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার থেকে সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদিগামী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মোট ৬১টি ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ২২টি। বাকি ৩৯টি ছিল ট্রানজিট ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা সৌদি আরবে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।

বেবিচকের তথ্যমতে, সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়ার ৪টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট রয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালাম এয়ারের ৩টি, ইজিপ্টএয়ারের ১টি, এমিরেটসের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৫টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ৫টি ফ্লাইট রয়েছে। এসব ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় সোমবার পর্যন্ত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী সৌদি আরবে যেতে পারেননি।

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত

রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

সোমবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসটি জানায়, সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ সময় ও তারিখ অনুযায়ী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে। এসব ফ্লাইটের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং নতুন যাত্রাসূচি যথাসময়ে জানানো হবে।

এদিকে, দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে তাদের সব ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করেছে। সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম।

তিনি জানান, ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের তা জানিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সৌদিগামী যাত্রীদের আপাতত বিমানবন্দরে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

কামরুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, টিকিট বুকিং ও অন্যান্য তথ্য জানতে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র অথবা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

প্রবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দূতাবাসের

সৌদি আরবে হুতি গোষ্ঠীর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। সোমবার প্রকাশিত এক ‘অতি জরুরি’ বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে প্রবাসীদের সতর্কতা অবলম্বন এবং দূতাবাসের নির্দেশনা অনুসরণ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দাবি হেফাজতের

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিমানবন্দরসহ যেকোনো বেসামরিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা বন্ধে জাতিসংঘ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।

সোমবার দেওয়া এক শোকবার্তায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক যাত্রী ও নাগরিক আহত হওয়ার ঘটনায় শোক ও তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সংগঠনটি বলেছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও হতাহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে, ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসা ও বসবাসের অনুমতি নিয়ে জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই অনিশ্চয়তা কতটা দীর্ঘ হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।