নাটোরে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ঋণ ও অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির তথ্য দেখানোর অভিযোগে দুই কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দুই কর্মকর্তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাময়িক বরখাস্ত করা পাঁচ কর্মকর্তাকে তাদের বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে ব্যাংকের প্রধান শাখায় সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন থেকে নাটোর ও নওগাঁর প্রধান শাখায় গোপনীয়ভাবে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সোমবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
যেসব শাখায় অডিট
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্প্রতি নাটোর শহরের বাসস্ট্যান্ড শাখা (পুরোনো মহিলা শাখা), স্টেশন বাজার শাখা, গুরুদাসপুর ও চাঁচকৈড় শাখায় অভ্যন্তরীণ বিশেষ অডিট পরিচালনা করে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
অডিটে এসব শাখায় ঋণ ও আমানত সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাসস্ট্যান্ড শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক এবং বর্তমানে নওগাঁ প্রধান শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার লিটন কুমারের বিরুদ্ধে ৯২ লাখ ৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই শাখার সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার এবং বর্তমানে নওগাঁর টিটিডিসি শাখার ব্যবস্থাপক বিপুল কুমার পালের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া লিটন কুমারের বিরুদ্ধে সেরা শাখা ব্যবস্থাপকের পুরস্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকার ভুয়া ও মিথ্যা ঋণ এবং অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির তথ্য দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে বিপুল কুমার পাল সহযোগিতা করেছেন বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
অভ্যন্তরীণ অডিটে আরও তিন শাখার সাবেক ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ভুয়া ঋণ ও অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির তথ্য দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
-
নাটোর স্টেশন বাজার শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে প্রধান শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এএইচএম রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
-
গুরুদাসপুর শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে প্রধান শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ভুয়া ঋণ ও অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে।
-
চাঁচকৈড় শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে বড়াইগ্রাম শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ভুয়া ও মিথ্যা ঋণ এবং অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির তথ্য দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অভিযুক্তরা সেরা শাখা ব্যবস্থাপক হওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি করেছেন।
দুই কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ঋণপত্র তৈরি এবং অতিরিক্ত আমানত বৃদ্ধির তথ্য দেখানোর অভিযোগে লিটন কুমার ও বিপুল কুমার পালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার ইনচার্জ মো. শওকত জামানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের সব ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
লিটন কুমারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বিপুল কুমার পাল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, সাময়িক বরখাস্ত বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কোনো লিখিত চিঠি এখনো তিনি হাতে পাননি। তবে বিষয়টি লোকমুখে শুনেছেন। লিখিত চিঠি পেলে এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন বলেও জানান তিনি।
সোনালী ব্যাংকের নাটোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম ও ইনচার্জ আহসান রেজা পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দুই কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান তিনি।



