সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি ও উৎমাছড়া এলাকার প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ—বিশেষ করে সাদাপাথর—গত এক বছরে সংঘবদ্ধভাবে লুটপাট হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এ লুটে জড়িত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাকর্মীসহ অন্তত ৪২ জন ব্যক্তি। লুটের অর্থমূল্য আনুমানিক ৮০ কোটি টাকা, যার বড় অংশটাই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বণ্টিত হয়েছে কমিশন হিসেবে।
কারা জড়িত?
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাথর লুটপাটে জড়িত ছিলেন সিলেটের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ, একাধিক ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), পুলিশ সুপার, ডিবি ও থানা পুলিশ। পিআইও নামক পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ নজরদারি ইউনিটের সদস্যরাও এই চক্রে সুবিধাভোগী ছিলেন।
কমিশনের হিসাব
প্রতিটি পাথরবাহী ট্রাক থেকে প্রশাসনের কাছে গিয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে। ৪ কোটি ঘনফুট পাথর উত্তোলনের জন্য প্রায় ৮০ হাজার ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। সেই হিসাবে, কমিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৮০ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ লুটপাটে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অন্তত ৩১ জন নেতাকর্মী। সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে বিএনপির নেতাদের। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
প্রশাসনের ব্যর্থতা ও যোগসাজশ
তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন পাথর লুট বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা চুপ থেকেছেন বা সহযোগিতা করেছেন। কোম্পানীগঞ্জের চারজন ইউএনও– আজিজুন্নাহার, আবুল হাসনাত, ঊমী রায় এবং আবিদা সুলতানার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
পাথর উত্তোলনে পুলিশের তিনটি ‘শর্ত’ ছিল: ট্রাক না আটকানো, অভিযান না চালানো এবং উত্তোলনে বাধা না দেওয়া। এসব শর্ত মানলে ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো সংশ্লিষ্টদের। নৌকা ব্যবহার করেও পাথর উত্তোলন করা হতো, সেখান থেকেও কমিশন পেতেন প্রশাসনের সদস্যরা।
বিজিবির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নৌকাপ্রতি বিজিবি সদস্যদের ৫০০ টাকা করে নেওয়ার তথ্য রয়েছে। যদিও ৪৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধান ও সুপারিশ
কালবেলার অনুসন্ধান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকেরও গাফিলতি এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনিক উদ্যোগ
সিলেট জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে সাত পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যাতে ১৩৭ জনের নামের তালিকা যুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা
দুদক বলছে, অভিযুক্তদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে তারা বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য অনুমতি চেয়েছে কমিশনের কাছে।
বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্য
বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “পাথর চুরিকে উৎসাহিত করার মতো কিছু বলিনি। পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে প্রকৃত অপরাধীদের নাম প্রকাশ করা হবে।”



