সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলা, তদন্ত ও বিচার পরিচালনায় আইনগত বাধা নেই বলে মত দিয়েছেন দেশের একাধিক বিশিষ্ট আইনজীবী। তাদের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সীমিত দায়মুক্তি দিলেও ব্যক্তিগত অপরাধ, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি দাবি করেছেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। শনিবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি কী অপরাধ করেছি? আমাকে হেয় করার জন্যই এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।”
স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ
শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ, দুদকে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, ব্যাংক খাতসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিভিন্ন অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকলে তা আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে মামলাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কী বলছে?
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির জন্য দুটি ধরনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।
- ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনের সময় করা কোনো সরকারি কাজ বা কোনো সিদ্ধান্তের জন্য আদালতে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন না।
- ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের বা বিচার পরিচালনা করা যাবে না এবং তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
তবে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা প্রযোজ্য কি না, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মত
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে সব ধরনের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয় না। দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীনও একই মত প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরের কোনো কর্মকাণ্ড সংবিধানের এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, সংবিধানে কেবল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রদত্ত সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা দায়িত্ব শেষে সংঘটিত কোনো অপরাধের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না মনে করেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে এবং এ বিষয়ে আদালতের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত হবে।
এরশাদের উদাহরণ
আইনজীবীরা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উদাহরণও তুলে ধরেছেন। ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তিনি দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ছিলেন। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর আইনগত বিচারের নজির বাংলাদেশে রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক নজির
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার রায়ও এ ধরনের আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগ
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যেসব অভিযোগ আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দুদকের কমিশনার থাকাকালে কিছু দুর্নীতির তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ।
- পদ্মা সেতু প্রকল্প-সংক্রান্ত তদন্তে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ।
- বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন।
- দুদক থেকে অবসরের পর ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
- ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর অনুসন্ধান নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল।
তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি এবং কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ নিয়ে আইনি বিতর্ক
দুদক আইনের একটি বিধান অনুযায়ী সাবেক কমিশনারদের লাভজনক সরকারি পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছিল। পরে হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ উভয়ই রায় দেন যে রাষ্ট্রপতির পদ “লাভজনক সরকারি পদ” নয় এবং তিনি নির্বাচিত হন, নিয়োগপ্রাপ্ত নন। ফলে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে আদালত মত দেন।



