গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে সাতবারেরও বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর শুরু ২১ নভেম্বর ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প দিয়ে। এরপর গত বুধবার রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার কম্পন এবং বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। যদিও বড় ধরনের সুনামি হয়নি, তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—ইন্দোনেশিয়া বা আন্দামান–নিকোবর অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিবিসি জানায়, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে দুই লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়। সেই সুনামির ঢেউ আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে—যেখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল।
ভূমিকম্প ও সুনামি: সম্পর্ক কোথায়?
ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, সাগরে ৬.৫ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে সুনামির সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সুনামি সতর্কতা কেন্দ্রগুলো পানি উচ্চতা ও সম্ভাব্য আঘাতস্থল বিশ্লেষণ করে সতর্কতা জারি করে।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ছোট ভূমিকম্প হয়, তবে চার মাত্রার মতো দুর্বল কম্পন থেকে বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। তবে ভূমিতে বড় ভূমিকম্প হলেও উপকূলে সুনামির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্প কেন হয়?
পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত, যা সারাক্ষণ নড়াচড়া করে। কোথাও প্লেট একে অপরকে ঠেলে দেয়, কোথাও পাশ কাটায়—আবার কোথাও একটি প্লেট আরেকটির নিচে ঢুকে যায়। এ ধরনের গতিবিধির কারণেই ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
প্রাচীন কালে পৃথিবীর সব মহাদেশ একসঙ্গে যুক্ত ছিল—এমন তত্ত্বের প্রমাণ হিসেবে সমুদ্রের নিচে থাকা দীর্ঘতম পর্বতমালা ‘মিড-আটলান্টিক রিজ’ উল্লেখযোগ্য।
সুনামি কীভাবে সৃষ্টি হয়?
সুনামি হলো বিশাল আকারের ঢেউয়ের সমষ্টি। সাধারণ ভূমিকম্পে সুনামি হয় না—এটির জন্য লাগবে শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং অগভীর সমুদ্রতল।
যদি সমুদ্রতল হঠাৎ ওপরে বা নিচে সরে যায়, তবে বিশাল পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত হয়ে সুনামি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?
বিশ্বে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক দূরে। বাংলাদেশ চট্টগ্রাম–আরাকান হয়ে আন্দামানের দিকে থাকা দুটি বড় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন—বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি এলাকায় সমুদ্রতলের বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কম। তবে আন্দামান–নিকোবর অঞ্চলে যদি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, সেটি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফারজানা সুলতানা জানান, বাংলাদেশ সবসময় টেস্ট-ভিত্তিক প্রস্তুতি রাখে, যাতে সতর্কতা পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ইতিহাস কী বলে?
১৯৬২ সালে আরাকান উপকূলে সাড়ে আট মাত্রার ভূমিকম্পে বড় সুনামি হয়েছিল—যা উপকূল অতিক্রম করে অনেক দূর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল। সে সময় ঢাকায় নদীপানিও বেড়ে যায় এবং প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যুর কথা জানা যায়।
ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানিয়েছেন—এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির সময়সীমা ৫০০–৯০০ বছর। ১৯৬২ সালের পর এমন বড় ভূমিকম্প হয়নি, তাই বড় কম্পনের সম্ভাবনা খুব শিগগির নয়।
বাংলাদেশ কেন প্রভাবিত হয়?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক আকৃতি ‘ফানেল শেপ’ বা চোঙ্গা আকৃতির। ফলে ভারত মহাসাগর বা আন্দামানে বড় সুনামি হলে তার একটি অংশ বাংলাদেশের দিকেও আসতে পারে—যদিও তা ইন্দোনেশিয়ার মতো ভয়াবহ হবে না।
শেষ কথা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—ভূমিকম্প আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হলেও সুনামির সতর্কতা তুলনামূলক সহজ। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা সমুদ্রে নয়—দেশের অভ্যন্তরে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনাই বেশি উদ্বেগের বিষয়।



