বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে—এই গতি থামবে না। বিশেষ করে পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণসহ ব্যাংক খাতে চলমান সব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
রোববার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সৌজন্য সাক্ষাতে এসব দিকনির্দেশনা দেন নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এবিবি’র চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংক-এর এমডি মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে ১৯টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বৈঠকে অংশ নেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কার অব্যাহত রাখার বিষয়ে গভর্নরের এই বার্তার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক–এর একীভূতকরণ নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা হচ্ছিল, তা পরিষ্কার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, গভর্নর স্পষ্ট করে বলেছেন—যেসব ব্যাংক একীভূত (মার্জ) করা হয়েছে, সেগুলো একীভূতই থাকবে। আমানতকারীদের আস্থার সংকট কাটাতে এ সিদ্ধান্ত জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নীতি সহায়তা দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এজন্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করা এবং সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
আলোচনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং নতুন গভর্নর নিয়োগকে কেউ কেউ নেতিবাচকভাবে দেখছেন বলেও উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “অস্থিরতার কিছু নেই, সব কার্যক্রম আগের মতোই চলবে।” ৫ আগস্টের পর যেসব ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেগুলোর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
বৈঠকে সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের প্রশংসা করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, তবে মিডিয়ায় তার কিছু বক্তব্য ব্যাংক খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। “আমি সেই পথে হাঁটবো না,” বলেন তিনি। এছাড়া সুদের হার কমানোর বিষয়েও মত দেন নতুন গভর্নর। তবে ব্যাংকের এমডিরা এ বিষয়ে আরও সময় নিয়ে বিবেচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে গভর্নর স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা দেওয়া হবে এবং ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে ভাড়া নির্ধারণে অঞ্চলভিত্তিক একটি রেট নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলে এ বিষয়ে আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে না। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক সিএমএসএমই পণ্যে অর্থায়নের সমস্যা দূর করে ব্র্যান্ডিং জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে মাসরুর আরেফিন বলেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠনসহ ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। নতুন গভর্নর কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না বলে আশ্বস্ত করেছেন। ঋণ বিতরণ বা সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হলে সরাসরি তাকে জানাতে বলা হয়েছে।
গভর্নর বিদেশি প্রতিনিধি ও ঋণদাতাদের জন্য চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি ‘বাংলাদেশ ডে’ আয়োজনের ধারণা দিয়েছেন। এছাড়া ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় আঞ্চলিক পণ্যকে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনিরকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।



