লিওনেল মেসি যেন এক ক্লান্ত জাহাজী। বছরের পর বছর আর্জেন্টিনা নামের ঐতিহ্যবাহী জাহাজটিকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র। কখনো ঢেউ ছিল উন্মত্ত, কখনো চারপাশে ছিল অন্ধকার। তবু হাল ছাড়েননি। একের পর এক ঝড় পেরিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন গন্তব্যে।
কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম—যাত্রারও একদিন শেষ হয়। থামতে হয় দীর্ঘ পথচলার। সেই নিয়ম মেনেই অবশেষে থামলেন মেসি। আকাশি-সাদা জার্সিতে খেলে ফেললেন নিজের বিদায়ী ম্যাচ। এরপর? এ পথটাই যাওয়া, এর আর কোনো ফিরে আসা নেই।
সোনালি সময়ে মেসির পায়ে ছিল জাদু। মায়াবি ড্রিবলে মুহূর্তেই ছিটকে বেরিয়ে যেতেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক ডিফেন্ডারের জটলা থেকে। সেই পুরোনো ঝলক বিদায়ী ম্যাচে পুরোপুরি দেখা গেল না। বয়স আর ক্লান্ত পা যে সবকিছু আগের মতো করতে দেয় না!
তবে একটা জায়গায় মেসি বদলাননি—দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে সামনে দাঁড়ানো।
পুরো ক্যারিয়ারে মাঝদরিয়ায় পথ হারানো আর্জেন্টিনাকে কখনো গোল করে, কখনো গোল করিয়ে তীরে তুলেছেন তিনি। বেনিনের বিপক্ষেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে তিন গোলেই জড়িয়ে থাকল মেসির নাম। দুটি গোল করালেন সতীর্থদের দিয়ে, আর একটি নিজেই করলেন। বিদায়ী ম্যাচেও ক্লান্ত জাহাজীর কাঁধেই ছিল আর্জেন্টিনার ভার। শেষবারের মতো সেই দায়িত্বও সুনিপুণভাবে পালন করলেন তিনি।
গোল না পেলেও প্রথমার্ধে দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা ছিলেন মেসিই। প্রতিপক্ষের বিপদসীমায় ছয়বার বল ছুঁয়েছেন। পেয়েছিলেন প্রথমার্ধের সেরা দুই সুযোগের একটিও। অন্য সুযোগটিও তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু বিরতির আগে গোলের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা।
অচলাবস্থা ভাঙতে অপেক্ষা করতে হলো ৪৭ মিনিট পর্যন্ত। কর্নার থেকে মেসিই তৈরি করলেন সুযোগ। আর সেই সুযোগকে গোলে পরিণত করলেন আরেক ‘ক্লান্ত জাহাজী’—নিকোলাস ওতামেন্দি।
আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্মের অন্যতম এই সেনানীও মেসির সঙ্গে আজ বিদায় বলেছেন আকাশি-সাদা জার্সিকে। বিদায়ী ম্যাচটাকে স্মরণীয় করে রাখতে বেছে নিলেন দুর্দান্ত এক গোল। এমন গোল, যা দেখে কোনো ফরোয়ার্ডও হয়তো ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে পারেন।
অনেকটা পেছন থেকে ছুটে এসে প্রতিপক্ষ রক্ষণে হানা। বল আসার আগেই লাফিয়ে ওঠা। এরপর মুহূর্তের নিখুঁত হিসাব—বল ছুঁয়ে আলতো এক টোকা, আর তা সরাসরি জালে। ওতামেন্দির গোলেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয় গোলের জন্য অবশ্য বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামা নিকো পাজকে বক্সের বাইরে বলটি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মেসি। সেখান থেকে পাজের দারুণ এক কার্লার জড়িয়ে যায় বেনিনের জালে।
ব্যবধান দ্বিগুণ হয়, আর মেসির নামের পাশে জমা পড়ে আরও একটি অ্যাসিস্ট।
বিদায়ী ম্যাচের জন্য এতটুকুই হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মেসি যেন জানতেন, গল্পটা শেষ করতে হবে নিজের হাতেই। তাই শেষ অধ্যায়টাও লিখলেন নিজেই।
৭০ মিনিটে অগাস্তিন জিয়াই প্রতিপক্ষের বক্সে ফাউলের শিকার হন। আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় পেনাল্টি। স্পটকিক নিতে এগিয়ে এলেন মেসি। জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে পূর্ণ করলেন নিজের বিদায়ের রাত।
দুটি অ্যাসিস্টের পর এবার গোলও। বিদায়ী ম্যাচে মেসির নামের পাশে সবকিছুই যেন পরিপূর্ণ। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে লিখে ফেললেন সেই কাঙ্ক্ষিত মধুরেণ সমাপয়েৎ।
সংখ্যায় এমন পারফরম্যান্সকে বন্দী করাই পরিসংখ্যানের কাজ। সোফাস্কোরের হিসাবে, এই ম্যাচে মেসির পারফরম্যান্সের রেটিং ৮.৫। পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই এমন পারফরম্যান্সের অসংখ্য নজির রেখে গেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনা যখন ঝড়ে দুলেছে, যখন মাঝসমুদ্রে পথ হারিয়েছে, যখন চারপাশের ঢেউ আরও উঁচু হয়েছে—তখন হুঁশিয়ার কাণ্ডারির মতো হাল ধরেছেন মেসি। কখনো গোল করে, কখনো সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়ে, কখনো নিজের জাদুতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন।
আজ তেমন কোনো ভয়ংকর ঝড় ছিল না। তবু শেষবারের মতো দেখিয়ে গেলেন সেই পুরোনো কায়দা। গোল করলেন, গোল করালেন, দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন।
তারপর?
জাহাজ থেমে গেছে। দীর্ঘ যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেসি।
এ পথটাই যাওয়া—এর আর কোনো ফিরে আসা নেই।



