tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়শেরেবাংলা নগরে যাচ্ছে সচিবালয়, ব্যয় হবে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা

শেরেবাংলা নগরে যাচ্ছে সচিবালয়, ব্যয় হবে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা

রাজধানীর আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে নতুন সচিবালয় নির্মাণে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্যে তিনটি নকশা তৈরি করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে একটি নকশা চূড়ান্ত করে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বর্তমান সরকারের মেয়াদেই প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ জন্য প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তরের তৈরি তিনটি নকশা উপস্থাপন করা হয়। সেগুলোর মধ্যে একটি নকশা চূড়ান্ত করে এর ভিত্তিতে প্রকল্প প্রণয়নের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে আবদুল গনি রোডের বর্তমান ভবনগুলোতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়, পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়সহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর স্থানান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলীতে হবে নতুন সচিবালয়

বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে সভায় তিনটি পৃথক নকশা উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। ওই নকশার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরি করা হবে। নকশাগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়ও উপস্থাপন করা হবে।

তিনি জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরির আগে সড়কের প্রশস্ততা এবং ওই এলাকায় কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, তা নিয়ে জরিপ করতে হবে।

প্রধান স্থপতি বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে নতুন সচিবালয়ের নকশা তৈরি করা হয়েছে। নকশায় এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সংসদ ভবনের মতো কোনো ফটক না থাকে।

এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ

সচিবালয় স্থানান্তরের প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে চায় সরকার।

এর আগেও নেওয়া হয়েছিল স্থানান্তরের উদ্যোগ

শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কয়েক দফায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে এ জন্য ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ হয়। সে সময় ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানের উত্তর দিকে এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে, যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে ৩২ একর জমিতে নতুন সচিবালয় নির্মাণের কথা ছিল।

জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল পরিকল্পনা অনুসরণ করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত নকশায় ১৪ তলা ভিত্তির ওপর নয়তলাবিশিষ্ট চারটি মূল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সে সময় লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে ওই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার। এর পরিবর্তে বিদ্যমান সচিবালয় প্রাঙ্গণের ভেতরেই একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি সচিবালয়ের পশ্চিম পাশে পরিবহন পুল ও জিপিও এলাকায় নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।

২১ তলা ভবনের প্রকল্প ফেরত, নতুন করে স্থানান্তরের উদ্যোগ

পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সচিবালয় স্থানান্তর নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ের ভেতরে ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়।

গত ২৬ এপ্রিল একনেকের সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। ওই সভায় সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এরপর গত পাঁচ মাসে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পর্যালোচনা শেষে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে স্থাপত্য অধিদপ্তরের তিনটি পৃথক দল তাদের তৈরি তিনটি নকশা তুলে ধরে।

সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্ত করে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এখন প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অপেক্ষা।