tanaka
প্রচ্ছদঅন্যান্যশুদ্ধি অভিযান ঘিরে বিএনপিতে সতর্কতা, অনেকে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিতে

শুদ্ধি অভিযান ঘিরে বিএনপিতে সতর্কতা, অনেকে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিতে

চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

একই সময়ে বিএনপির ভেতরেও দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর এক সাংগঠনিক পদক্ষেপের ঘটনা সামনে এসেছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনকে বহিষ্কারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে।

মিষ্টির পদত্যাগে আলোচনায় শুদ্ধি অভিযান

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১ অক্টোবর তিনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং পরে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

মিষ্টির বিষয়ে তদন্ত চলমান থাকার কথাও সরকারি পর্যায় থেকে জানানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও এক বিবৃতিতে বলেন, বিএনপি কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনার পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ এখন অনেকটাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

কমিটি বিলুপ্ত, তৃণমূলে সতর্কবার্তা

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিযোগের পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ওই এলাকার কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় কর্মীদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূলের নেতাদের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে—দলের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপরাধে জড়ালে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে এরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ ‘যুগান্তর’-কে বলেন, সরকারের নাম ব্যবহার করে যারা দল ও দেশের ক্ষতি করছেন, তাদের জন্য মিষ্টির বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ একটি সতর্কবার্তা। ব্যক্তিস্বার্থ, চাঁদাবাজি বা অপকর্মের দায় সরকার বা দল নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগে যুবদল নেতা বহিষ্কার

শুদ্ধি অভিযানের আলোচনার মধ্যেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুলিশের এক সদস্যকে মারধর এবং দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

২ অক্টোবর যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পদ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তার কোনো অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অপরাধীদের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোর দাবি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় বা পদ-পদবি তাকে আইনি ব্যবস্থা থেকে রেহাই দেবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীও বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধী চক্রের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে আইন প্রয়োগের যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেটি মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন।

বিদেশে যাওয়ার আলোচনা

এদিকে শুদ্ধি অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বিভিন্ন সূত্রে আলোচনায় এসেছে। তবে কারা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা আইনি ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে সবার নাম ও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির বিষয়টিকে আপাতত দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

দলের ভেতরে বাড়ছে সতর্কতা

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার বক্তব্য, সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নেতৃত্ব কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

সব মিলিয়ে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তি এবং যুবদল নেতা ইসমাইল হোসেনকে বহিষ্কারের মতো ধারাবাহিক ঘটনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অপরাধের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।