tanaka

এশিয়ান গেমস • কাবাডিতে কোরিয়া বধের পর বাংলাদেশের চোখ পদকে

এশিয়ান গেমসে পুরুষ কাবাডিতে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে লাল-সবুজ দল এখন তাকিয়ে আছে দিনের দ্বিতীয় ম্যাচের দিকে। বিকেলে চাইনিজ তাইপেকে...
প্রচ্ছদজাতীয় শিশু হাসপাতালে কান্না থামছে না

 শিশু হাসপাতালে কান্না থামছে না

মাত্র ছয় মাস বয়সী শিশু। নাকে লাগানো ফিডিং টিউব দিয়েই তাকে দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে বাবা-মা একে অপরের দিকে তাকান, আবার দৃষ্টি সরিয়ে নেন। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন—কান্না শুরু করলে কীভাবে খাওয়াবেন? নিজের সন্তানের এমন অসহায় অবস্থা দেখে চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করছেন সোহেল ভূঁইয়া ও রুমী আক্তার। তাদের প্রথম সন্তান হৃদয় এখন হাসপাতালে জীবনযুদ্ধ লড়ছে।

গাজীপুরে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালানো সোহেল ছেলেকে ভর্তি করিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ওয়ার্ডে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে তাদের হাসপাতালযাত্রা—এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। এ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা, যার বেশিরভাগই ধার।

সরেজমিনে দেখা যায়, একই চিত্র যেন পুরো ওয়ার্ডজুড়ে—অসংখ্য মা-বাবার চাপা কান্না আর উদ্বেগ। শনিবার সকাল ১১টা থেকে রোববার একই সময় পর্যন্ত নতুন করে ১২ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১০ জন। আগে থেকেই ভর্তি ছিল ৬৭ জন। বর্তমানে মোট ৬৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন।

সোহেল জানান, হঠাৎ করেই ছেলের জ্বর ও কাশি শুরু হয়। দুই দিনের মাথায় অবস্থা গুরুতর হয়ে যায়—গলা বন্ধ হয়ে যায়, কান্নার শব্দও বের হচ্ছিল না। প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পিআইসিইউ না থাকায় ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে সাত দিন নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়।

অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে ১৬ মার্চ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ২ এপ্রিল বাড়ি ফিরলেও দু’দিন পর শরীরে লাল দাগ, সঙ্গে আবার জ্বর-কাশি দেখা দেয়। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়—সে হামে আক্রান্ত। ৫ এপ্রিল আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা ১৩ দিন অক্সিজেন দিতে হয়েছে, এখনও টিউব দিয়ে খাওয়ানো চলছে।

“এখন হামের অবস্থা নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু নিউমোনিয়া পুরোপুরি সেরে ওঠেনি,” বলেন সোহেল। “চিকিৎসা চালাতে গিয়ে সব সঞ্চয় শেষ। এখন ধার করে চলছি। এতদিন কাজে বের হতে পারিনি।”

একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে আট মাস বয়সী আয়েশা আক্তার। ময়মনসিংহ থেকে আসা এই শিশুটি ১৪ দিন আইসিইউতে ছিল। তার খালা শাহনাজ বেগম জানান, শুরুতে ঠান্ডাজনিত সমস্যা মনে হলেও পরে ধরা পড়ে হাম। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় আনার পরও সিট পেতে এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।

“এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু এখনো মুখে খাবার দেওয়া যাচ্ছে না—শুধু স্যালাইন চলছে,” বলেন তিনি। “আয়েশার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।”

ওয়ার্ডের আরেক কোণে পাঁচ মাস ২২ দিনের শিশু জিসানকে নিয়ে বসে আছেন তার বাবা-মা সুজন ইসলাম ও সোনিয়া আক্তার। বরিশাল থেকে আসা এই পরিবারটিও একই রকম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। সুজন ভ্যান চালিয়ে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, “প্রথমে জ্বর-কাশি, পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বরিশালে চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়েছে।” ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জিসানের অক্সিজেন খুলে দেওয়া হয়েছে, তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।

“আমার আয় সীমিত। ঢাকায় এই কয়েকদিনেই ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। নিজের কোনো সঞ্চয় নেই, এখন ধার করে চিকিৎসা চালাচ্ছি,” বলেন সুজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত হামে মোট ৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৮১ শিশু।

হাসপাতালের প্রতিটি করিডর, প্রতিটি বেড যেন একেকটি পরিবারের অজানা আতঙ্ক আর নীরব কান্নার সাক্ষী।