tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গঠিত কমিটি। বহরে একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকার পরও কেন ত্রুটির ইতিহাস থাকা নির্দিষ্ট উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল, আগের ত্রুটিগুলো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়েছিল কি না এবং জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে ত্রুটি সারাতে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় ভিভিআইপি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় এসব বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দল, নারিতা স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার এবং বিমানের মেইনটেন্যান্স কন্ট্রোল সেন্টারের (এমসিসি) কর্মকর্তাদের কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথিপত্র।

তদন্তের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বিমানের বহরে একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও কেন এস২-এজেওয়াই উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উড়োজাহাজটির কারিগরি সক্ষমতা, সর্বশেষ রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা, অতীতের ত্রুটির রেকর্ড এবং বিকল্প উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করছে কমিটি। উড়োজাহাজ নির্বাচনের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও দাপ্তরিক নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং কারিগরি ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে। নারিতা বিমানবন্দরে একের পর এক ত্রুটির সংকেত পাওয়ার আগে উড়োজাহাজটির কারিগরি অবস্থা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করছে তদন্ত কমিটি। এ জন্য গত তিন থেকে ছয় মাসের টেকনিক্যাল লগবুক, ত্রুটি শনাক্তের প্রতিবেদন, মেরামতসংক্রান্ত নথি এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণের রেকর্ড পরীক্ষা করা হচ্ছে।

প্রতিটি ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, মেরামত শেষে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং কার অনুমোদনে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

তৃতীয় প্রশ্নটি নারিতা বিমানবন্দরে যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লাগা নিয়ে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যে কাজ প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা, সেটি শেষ করতে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নারিতা বিমানবন্দরে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালিত না হওয়ায় সেখানে সংস্থাটির নিজস্ব স্থায়ী প্রকৌশলী ছিলেন না। ফলে ত্রুটি নিরসনে স্থানীয় গ্রাউন্ড সার্ভিস এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা পেতে বিলম্ব হয়েছিল কি না, ঢাকার এমসিসির সঙ্গে যোগাযোগে কোনো সমস্যা ছিল কি না এবং কারিগরি নির্দেশনা আদান-প্রদানে সমন্বয়হীনতা কাজ করেছে কি না, তা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে, নারিতা বিমানবন্দরে প্রাক্‌-উড্ডয়ন পরিদর্শন শেষে প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম উড়োজাহাজটির এয়ারওয়ার্দিনেস ও রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনের ছাড়পত্র দেন ক্যাপ্টেন ইমামুল। তবে উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে রানওয়ের দিকে যাওয়ার সময় ককপিটে স্পয়লার, ফ্লাপ কমান্ড, বাম পাশের পিটোট হিট এবং র‌্যাম ফ্যান-সংক্রান্ত একাধিক ত্রুটির সংকেত দেখা দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়ন বাতিল করে উড়োজাহাজটিকে আবার পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে নেন।

এ ঘটনায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালককে ইতোমধ্যে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমাও তিন কার্যদিবস বাড়ানো হয়েছে। চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা জমা দিতে পারেনি কমিটি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ নির্বাচন, কারিগরি পরীক্ষা এবং উড্ডয়নযোগ্যতার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা অপরিহার্য। শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে কারিগরি পরীক্ষা ও চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ জানিয়েছেন, উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি তারা স্বীকার করছেন। তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও পরবর্তী দাপ্তরিক ব্যবস্থা জানানো হবে।