জ্বালানি তেলের সংকট যেন কাটছেই না, বরং ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। বিশ্ববাজারে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে সরকার নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করলেও এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি পেট্রোল পাম্পগুলোতে। আগের মতোই দীর্ঘ লাইন, বিশৃঙ্খলা এবং তেল সংগ্রহে দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। দাম বাড়লে চাপ কিছুটা কমবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও রোববার রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
গণপরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় ইতোমধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শনিবার রাতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে, যা রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে বাস্তবে পাম্পগুলোতে চাপ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
সরেজমিনে মতিঝিলের রহমান ফিলিং স্টেশন, মেঘনা ফিলিং স্টেশন, করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন, রমনা ফিলিং স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস, পূর্বাচল ট্রেডার্স এবং তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়—বাইকার ও গাড়িচালকদের দীর্ঘ সারি আগের মতোই রয়েছে। অনেকেই রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পরদিন তেল সংগ্রহ করছেন। দিনের বেলায় তীব্র রোদ উপেক্ষা করেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিসে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাংলামোটর এলাকা পর্যন্ত যানবাহনের লাইন দেখা যায়। দুপুর ৩টায় গিয়ে দেখা যায়, চালকদের ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল মিলছে। মতিঝিলের রহমান ফিলিং স্টেশনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে, যেখানে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পেয়েছেন অনেক চালক। অপেক্ষার ক্লান্তিতে কেউ কেউ মোটরসাইকেলের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়ছেন। সড়কের একাংশ দখল করে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ফুটপাথে সারিবদ্ধ মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
একই এলাকায় মেঘনা ফিলিং স্টেশনে তেলের সংকট থাকায় ৩০০ টাকায় অকটেন বিক্রি করা হচ্ছিল। এখানেও ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
মতিঝিলের রহমান ফিলিং স্টেশনে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করা বেসরকারি চাকরিজীবী ওয়ারেজ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক বাজারে সংকট থাকলেও দাম বাড়ানোর পর অন্তত ভিড় কমবে বলে আশা করেছিলেন। “২০ টাকা বেশি দিয়ে যদি সহজে তেল পাওয়া যেত, তাহলে এই ভোগান্তি সহ্য করতে হতো না,” বলেন তিনি।
মেঘনা মডেল সার্ভিসে ব্যাংক কর্মকর্তা মালেক হোসেন জানান, দাম বাড়লেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। “৪-৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে তেলের ঘাটতি স্পষ্ট। রেশনিং পদ্ধতি তুলে দেওয়া উচিত,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে, তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে প্রায় ১০ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল নিতে সক্ষম হন রাইড শেয়ার চালক রোমান আলী। তিনি বলেন, “অল্প বেশি দাম দিয়ে দ্রুত তেল পাওয়া গেলে বরং লাভই হতো। এই সময়টায় আমি আয় করতে পারতাম।”
রাইড শেয়ার ভাড়া বেড়েছে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার ভাড়ায়ও। স্বল্প দূরত্বে ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চালকদের দাবি, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষার কারণে তারা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে যাত্রী মোরশেদ আলম বলেন, “যেখানে আগে ১৫০ টাকায় যাওয়া যেত, এখন ২০০ টাকার নিচে কোনো রাইডার যেতে রাজি নয়।” একইভাবে ফার্মগেট থেকে গুলশান-২ রুটে যাত্রী আনোয়ার ইসলাম জানান, একদিনের ব্যবধানে ভাড়া ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
যাত্রীরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহনেই নয়, শিগগিরই নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়বে।



