tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়রোহিঙ্গাদের জন্য কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাড়ছে মানবিক সংকট

রোহিঙ্গাদের জন্য কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাড়ছে মানবিক সংকট

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়া। একদিকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কমছে। ফলে কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য চলতি বছর জাতিসংঘ ও এর অংশীদার সংস্থাগুলো ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের তুলনায় এবারের অর্থ চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার তহবিল সংকুচিত হওয়ায় এবার জীবনরক্ষাকারী ও সবচেয়ে জরুরি কার্যক্রমগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এক বছরে কমেছে সহায়তার চাহিদা

জাতিসংঘে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও এর অংশীদার সংস্থাগুলো দাতাদের কাছে ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে সেই চাহিদা কমিয়ে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সহায়তার আবেদনের পরিমাণ কমেছে ২২৪ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। বৈশ্বিক মানবিক তহবিলের সংকটের কারণে ২০২৬ সালের যৌথ পরিকল্পনাটি আগের তুলনায় সংকুচিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক করা হয়েছে।

জাতিসংঘের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত অর্থ দিয়ে মূলত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষায় অপরিহার্য সহায়তা কার্যক্রম চালু রাখার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করা হবে। ফলে অর্থের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় অর্থ দেওয়া অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য।

খাদ্য সহায়তাতেই প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা

২০২৬ সালের পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ খাতে চাওয়া হয়েছে ২৪৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।

বিভিন্ন খাতে সহায়তার চাহিদা তুলে ধরা হলো—

  • আশ্রয়: ১২৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।

  • পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি: ৬১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭৫৪ কোটি টাকা।

  • শিক্ষা: ৫২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬৪৯ কোটি টাকা।

  • স্বাস্থ্যসেবা: ৪৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা।

  • জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন: ৩৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা।

  • ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তা: ৩৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৪৬ কোটি টাকা।

এসব খাতের অর্থায়ন রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের বাড়তি চাপ মোকাবিলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি দেখা দিলে শিবিরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।

সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রোহিঙ্গাদের বড় অংশ

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলেও রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ এখনো মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিবিরের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করত। প্রায় ৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের উৎস ছিল অস্থায়ী ও অনিশ্চিত। অন্যদিকে, ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কর্মসূচির আওতায় নগদ আয়ের সুযোগ পেয়েছিল।

এ চিত্র থেকে স্পষ্ট, শিবিরের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের জন্য নিয়মিত ও স্থিতিশীল আয়ের ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও ন্যূনতম জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬৬ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। এই অর্থে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সুরক্ষা ও অন্যান্য জরুরি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

নতুন করে দেড় লাখ রোহিঙ্গার আগমন

রোহিঙ্গা সংকটের চাপ কমার পরিবর্তে আরও বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় ১২ লাখ।

নতুন করে মানুষের আগমন এবং দীর্ঘদিনের শরণার্থী পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব ও মানবিক চাহিদা বেড়েছে। সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস, মৌলিক সেবার ওপর চাপ এবং জীবিকার সুযোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

২০২৬ সালের সংশোধিত যৌথ পরিকল্পনা বা জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেসরকারি সংস্থাসহ মোট ৯৮টি অংশীদার যুক্ত রয়েছে।

২০২৫ সালে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে সমুদ্রযাত্রা

অর্থের সংকটের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় নিকট ভবিষ্যতে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অনিশ্চিত। বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের শিবিরজীবন, জীবিকার সীমিত সুযোগ এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৫ সাল ছিল রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। গত এপ্রিলেও ২৭০ জনের বেশি মানুষ বহনকারী একটি নৌযান ডুবে যায়। ওই ঘটনায় মাত্র নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

এ ধরনের ঘটনা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নির্মম চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, শিবিরে মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে মানুষ কতটা বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে।

সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই

রোহিঙ্গা সংকটের তাৎক্ষণিক মানবিক চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা অপরিহার্য। তবে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর মতে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রধান পথ।

২০২৬ সালের যৌথ পরিকল্পনার প্রথম কৌশলগত লক্ষ্যও রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কাজ করা। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।

সব মিলিয়ে, রোহিঙ্গা সংকট এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, অন্যদিকে শরণার্থীর সংখ্যা ও তাদের মৌলিক চাহিদা বাড়ছে। নতুন করে আগমন, দীর্ঘস্থায়ী শিবিরজীবন এবং রাখাইনে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ অবস্থায় শুধু মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে সংকট মোকাবিলার সুযোগ নেই। বরং পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায়, সহায়তার ঘাটতি রোহিঙ্গাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক চাপও বাড়িয়ে তুলবে।