একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকরা মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার যে সুযোগ পেয়েছিলেন, তা আর থাকছে না। ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ায় ওই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমসহ সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর বিতর্কিত সাবেক পরিচালকদের পরিচালনা পর্ষদে ফেরার সুযোগও থাকছে না।
সরকার ব্যাংক রেজ্যুলেশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে। এতে ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে খসড়াটির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, তপশিলি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব বা অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ কোনো ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে ১৮(ক) ধারার আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। এ কারণে ধারাটি বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তপশিলি ব্যাংকের আর্থিক সংকট দ্রুত মোকাবিলা এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রথমে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটিকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি বিল আকারে উত্থাপন করা হলে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য তা সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশের কয়েকটি বিধান বিধিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য আলাদা করা হয়। পাশাপাশি সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক দায়, আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনে নতুন করে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
১৮(ক) ধারার মাধ্যমে প্রচলিত রেজ্যুলেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজারভিত্তিক একটি বিকল্প ব্যবস্থা চালুর সুযোগ রাখা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সংকটে পড়া ব্যাংককে সচল রেখে পুনর্গঠন করা, মূলধন ও তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করা এবং ব্যাংক উদ্ধারে সরকারের আর্থিক সম্পৃক্ততা কমানো।
পরবর্তীতে সংসদে ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ পাস হয়। তবে আইন কার্যকর হওয়ার পরও ১৮(ক) ধারার আওতায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। ফলে ধারাটি কার্যকর রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ধারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটে পড়া ব্যাংকের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিতর্কিত মালিক ও পরিচালকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ, অনিয়ম ও পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণের কারণে যেসব ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেসব ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল।
উল্লেখ্য, ১৮(ক) ধারাটি নিয়ে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এ ধারার আওতায় সংকটে পড়া বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের পুরোনো পরিচালকরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারতেন। ব্যাংক খাতের বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের আপত্তিও এ বিধানকে ঘিরে আলোচনায় আসে।
এখন সংশোধনী আইন কার্যকর হলে ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত হবে। ফলে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের জন্য ওই বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে ১৮(ক) ধারা বাতিল হলেও ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব কিংবা অস্তিত্বের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের অন্যান্য বিধান বহাল থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় রেজ্যুলেশন কাঠামো বজায় রেখেই বিতর্কিত মালিকদের পুনঃনিয়ন্ত্রণের সুযোগ বন্ধ করার একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান তৈরি হবে।



