tanaka

ভরিতে সোনার দাম বাড়লো ২১৫৮ টাকা

দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে...
প্রচ্ছদটপ নিউজবিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: সংকটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প

বিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: সংকটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা আপাতত কমে এলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো বাংলাদেশে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প কঠিন সময় পার করছে।

বাংলাদেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং মিলগুলো ব্যাপকভাবে গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর। দেশের ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে। গত ৬ জুন রাজধানী ঢাকার একটি বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় ১,৯০০ কর্মীকে ছাঁটাই করে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মরত, যাদের অধিকাংশই নারী। এছাড়া প্রায় ৪ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ আসে এই শিল্প থেকে। বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, শুধুমাত্র চীনের পরেই।

তবে এই খাত আগে থেকেই নানা সংকটে ছিল। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের সময় বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, কয়েকটি কারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। একই সঙ্গে গত তিন বছরে ৪০০টিরও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত মে মাসে সরকার ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা এবং চট্টগ্রামে প্রায় আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং কার্যকর করে। উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পাশাপাশি জেনারেটর চালু করতে সময় লাগায় উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হয়।

এর ফলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পোশাক উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। উৎপাদন বিলম্ব, শিপমেন্টে বিঘ্ন এবং ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছেন।

একজন পোশাক কারখানা মালিক জানান, যুদ্ধ শুরুর পর তার প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত টানা ১০ মাস ধরে পোশাক রপ্তানি নিম্নমুখী রয়েছে এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি। সিনথেটিক ফাইবার, রং, বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত রাসায়নিক, প্লাস্টিকের বোতাম ও জিপারের মতো উপকরণ মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ জুড়ে থাকে। এসব উপকরণের বেশিরভাগই পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক। বিশেষ করে পলিস্টার উৎপাদনে ব্যবহৃত ন্যাফথার দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।

এদিকে উৎপাদন ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন কাঠামোর কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধাপে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তার মতে, শুধু পরিবহন খরচই প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও, প্রায় ৭ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ অনেক কারখানা মালিকের জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে পোশাকের দাম বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চাপই বহন করতে হচ্ছে দেশীয় উদ্যোক্তাদের।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানার অন্তত ৯,৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো আবারও শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি মাধবপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে গিয়ে শ্রমিক সমোলি খাতুন কারখানার গেটে লে-অফের নোটিশ দেখতে পান। ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অন্য কোনো চাকরি পাওয়া এখন খুব কঠিন। একজন নারী হিসেবে আমার বিকল্প সুযোগও সীমিত। প্রয়োজনে হয়তো আমাকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপে রয়েছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার কার্যকর নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।