ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৫১ দফায় সমন্বিত ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ শীর্ষক রূপরেখার আলোকে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। বিকাল ৩টা ৩২ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো—
১. প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; এই সহায়তার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।
২. কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা; একই সুবিধা পাবেন মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু।
৫. তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
৭. পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা প্রবর্তন।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ জোরদারে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব গঠন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।
ইশতেহারে বলা হয়, এটি কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই রাজনীতির মূলকেন্দ্র—এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করা হয়।
জনগণের রায়ে ক্ষমতায় এলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে—সবার আগে বাংলাদেশ।



