বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি এই মাদক লাখো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে বলে এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস।
প্রতিবেদনে ‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনামে এক ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, একসময় তিনি নিজের পোষা পাখির যত্ন নিতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন এবং নিয়মিত সময় কাটাতেন তার সঙ্গে। কিন্তু ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পর সেই স্বাভাবিক জীবন আর নেই। তার ভাষায়, “এই মাদক আমার মাথাটা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।”
থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগলা ওষুধ’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ বর্তমানে এই মাদক সেবন করছেন এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
মেটালফ্রিক জানান, তিনি টিনফয়েলের ওপর ইয়াবার বড়ি গরম করে ধোঁয়া টানেন। প্রতিটি বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কখনও টানা তিন দিন জেগে থাকার পর তিনি একটানা ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। তিনি বলেন, নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এদিকে চলতি মাসে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিলও সংসদে পাস হয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৮ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সময় মাদকের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এসব ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানে ৪৬৬ জন নিহত হন এবং কয়েক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর অভিযানের পরও মাদকের ব্যবহার কমেনি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, মাদকাসক্তি কমাতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, দেশে মাত্র প্রায় ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। একইভাবে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানীরও তীব্র সংকট রয়েছে।
তার মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য না হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান না। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন না।
ডা. আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবা আসক্তি বর্তমানে খুবই সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেক ব্যবহারকারী ইয়াবার পাশাপাশি বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন ট্যাবলেটও গ্রহণ করেন। তার মতে, প্রায় সব ধরনের মাদকের ব্যবহার বাড়লেও ইয়াবার বিস্তার সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার কেউ কেউ আসক্তির খরচ মেটাতে শেষ পর্যন্ত মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির মতো বড় ধরনের সংকটও আসক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, একসময় ট্রাকচালকসহ কিছু পেশাজীবীর মধ্যে ইয়াবার ব্যবহার সীমিত থাকলেও পরে এটি যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল।
থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে প্রবেশ করা অধিকাংশ ইয়াবার উৎস মিয়ানমার।
মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশে অনেকেই প্রথমে সিগারেট, পরে গাঁজা, এরপর কাশির সিরাপ এবং শেষ পর্যন্ত ইয়াবায় আসক্ত হন। তার ভাষায়, প্রথমে তিনি এটিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার উপকরণ মনে করেছিলেন, কিন্তু পরে বুঝেছেন, “এই মাদক মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।”
তিনি জানান, আগে ইয়াবা ছিল ব্যয়বহুল, এখন সস্তা ও দামি—দুই ধরনের ইয়াবাই সহজে পাওয়া যায়। সস্তা ইয়াবা দাঁত ও মুখের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারকারীদের আচরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। তার দাবি, অনেক বন্ধু স্ট্রোক, খিঁচুনি ও শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছেন।
মেটালফ্রিকের মতে, বর্তমানে ইয়াবা বাংলাদেশের মাদকবাজারে অন্য অনেক মাদককে প্রায় সরিয়ে দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই তরুণদের ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এসব অনিশ্চয়তা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে, যা অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নিজের জীবনের নানা সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন মেটালফ্রিক। বাবার মৃত্যু, ব্যবসা পুড়ে যাওয়া এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো অভিজ্ঞতা তাকে আরও হতাশ করেছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তার বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সীমাবদ্ধ।
তার ভাষায়, ইয়াবা মানুষকে এক ধরনের ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়, যার ফলে অনেকেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সন্ত্রাস, অপরাধ ও মাদকাসক্তি—সবকিছুর সঙ্গেই সম্পর্কিত। ইয়াবাকে তিনি ‘ধীরগতির বিষ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “এটি ধীরে ধীরে মানুষকে শেষ করে দেয়।”



