সম্প্রতি নতুন কয়েকটি দেশের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ১৫৭ দেশের স্বীকৃতি পেল ফিলিস্তিন। তালিকায় আছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ। অবশ্য তাতেও চোখ রাঙানি কমছে না ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্বীকৃতিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন না আনলেও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। তবে এসব দেশের ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ চাপসহ মানবিক কারণ রয়েছে বলেও মনে করেন তারা। এসব পশ্চিমা দেশগুলো সাধুবাদ জানিয়েছে ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব দেশকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এই পশ্চিমা দেশগুলোর ফিলিস্তিনের সমর্থন নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে না, ততক্ষণ বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে কাজ করবে।’
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ফ্রান্সসহ আরও ছয়টি দেশ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) বার্ষিক অধিবেশনের আগে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক সম্মেলনে সংস্থাটির স্থায়ী সদস্য দেশ ফ্রান্সসহ ছয় দেশের নেতারা এ স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। অন্য দেশগুলো হলো- অ্যান্ডোরা, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা ও মোনাকো। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারটি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করলো। এখনো স্বীকৃতি দেয়নি কেবল যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘নতুন ছয়টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও ইমিডিয়েট কোনো পরিবর্তন আমরা দেখবো না। তবে এ স্বীকৃতিকে ছোট করে দেখারও কোনো কারণ নেই। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৫৭টি ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে—মানে ৮০ শতাংশের বেশি দেশ। ফলে ইসরায়েল যেভাবেই প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখাক না কেন, এর ফলে তার ওপর চাপ বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বীকৃতি নিয়ে সমালোচনাও আছে। অনেকে বলছেন ‘টু লিটল, টু লেট’, অর্থাৎ অনেক দেরিতে ও সামান্য পদক্ষেপ। তবে এ সমালোচনার মধ্যেও স্বীকৃতির সিগনিফিকেন্স আছে। ইসরায়েল ইতোমধ্যে ওয়েস্ট ব্যাংকের আরও জায়গা দখল করার হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি হামাস ও অন্য সংগঠনকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবে এ স্বীকৃতিগুলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের ওপরই ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে।’ অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া ছয় দেশের পেছনের কারণ এক নয়। কোথাও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছে, কোথাও ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রভাব ফেলেছে। আবার কোথাও দেশীয় রাজনীতি শান্ত করার উদ্দেশ্যে এ স্বীকৃতি এসেছে। পাশাপাশি এমন দেশও আছে যারা মানবিকতা, মানবাধিকার বা একেবারে হিউম্যানিটারিয়ান অবস্থান থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রনি বসাক বলেন, ‘অবশ্যই নতুন দেশগুলোর স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের জন্য ভালো খবর। তবে এসব দেশের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করার মতো মানসিকতা-সক্ষমতা দুটোই যুক্তরাষ্ট্রের আছে। তাই ফিলিস্তিনের ওপর চলমান আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য যে এই দেশগুলোর স্বীকৃতি খুব প্রভাব ফেলবে তা বলা যাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে গণহত্যা বন্ধে এখনো সময় লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য হলো- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ দেশের মধ্যে কোনো একটি দেশ যদি নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাবের ওপর ভেটো (নারাজি) দেয়, তবে সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের আগে ১৯৮৮ সালে স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’



