দেশের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্ট বলে এক জাতীয় জনমত জরিপে উঠে এসেছে। স্বাধীন জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচালিত এ জরিপে অংশ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও সহায়তায় পরিচালিত ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক জরিপের ফল বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়। জরিপের মাঠপর্যায়ের কাজ চলতি আগস্ট মাসে পরিচালিত হয়। এ সময় সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি প্যানেলের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপ পরিচালনায় মোট ১০ হাজার ৪১৩টি কল করা হয়েছে।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মূল্যায়নে একটি চিত্র ফুটে উঠেছে, যাকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি মানুষের সন্তুষ্টি থাকলেও দেশ কোন পথে এগোচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব উন্নতি কতটা হয়েছে—এসব প্রশ্নে মতামত তুলনামূলকভাবে বিভক্ত।
প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টি সরকারের চেয়ে বেশি
জরিপে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন, তিনি ভালো করছেন না। আর ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত দেননি বা উত্তর দিতে চাননি।
বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ভেদে প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতেই এ হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি।
দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতার চিত্র উঠে এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সরকারের কাজকে ভালো বলেছেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা। অর্থাৎ সরকারের তুলনায় প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি মানুষের সন্তুষ্টির হার বেশি।
দেশ সঠিক পথে চলছে মনে করেন ৪৮.৬ শতাংশ
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। বিপরীতে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি।
দেশের গতিপথ নিয়ে মতপার্থক্যও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে রয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে উদ্বেগ
দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী—এমন প্রশ্নে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে এবং ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নিত্যপণ্যের দাম—এই তিন ক্ষেত্রেই সরকারের কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক মূল্যায়ন এসেছে। ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে এমন মত দিয়েছেন ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ।
আগামী এক বছর নিয়ে আশাবাদ
পারিবারিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে। বিপরীতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ কিছুটা বেশি। আগামী ১২ মাসে পরিবারের অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এক বছর আগের তুলনায় বেশি আশাবাদী। বিপরীতে ৩৯ শতাংশ কম আশাবাদী এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের আশাবাদে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ফ্যামিলি কার্ড ও করনীতিতে সমর্থন
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিও মানুষের উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়া গেছে। ফ্যামিলি কার্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ৭০ শতাংশ মনে করেন, গণভোটের রায় সরকারের বাস্তবায়ন করা উচিত।
বিরোধী নেতাদের গ্রহণযোগ্যতাও উল্লেখযোগ্য
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাজকে ভালো বলেছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি জানিয়েছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাবোধে পার্থক্য
নিজ এলাকায় সন্ধ্যার পর একা হাঁটার ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের নিরাপত্তাবোধ কিছুটা কম। ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা সন্ধ্যার পর নিজ এলাকায় একা হাঁটতে নিরাপদ বোধ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রকাশ্যে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পালনের ক্ষেত্রে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের নিরাপদ মনে করেন। মুসলিম উত্তরদাতাদের মধ্যে এ হার ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে হিন্দু উত্তরদাতাদের ৮২ শতাংশ প্রকাশ্যে ধর্ম পালনকে নিরাপদ বলে মনে করেন।
সব মিলিয়ে, জরিপের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে বর্তমান জনমতকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে দেখছে ডপলার রিসার্চ।



