-
প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব—বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছালেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি ছিলেন এবং সে সময় কারাবরণও করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে অর্থনীতি পড়ান তিনি।
পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
১৯৮৬ সালে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। তবে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
এর আগে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বিএনপির কঠিন সময়ে নেতৃত্ব
২০০৬ সালের পর দীর্ঘ সময় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, মামলা, আন্দোলন এবং সাংগঠনিক সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল।
২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।
খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দলের ভেতরে থেকে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। বিভিন্ন সময় মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।
‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিক
মির্জা ফখরুলকে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার কাছেও তুলনামূলকভাবে নম্র, বিনয়ী ও সংযত রাজনীতিক হিসেবে দেখা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতার বাইরে তার ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক আচরণ তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপির কঠিন সময়ে মির্জা ফখরুলের দৃঢ় নেতৃত্ব দলকে সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি নাট্যচর্চা, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল।
রাষ্ট্রপতি ভবনে নতুন অধ্যায়
পৌর রাজনীতি দিয়ে যার রাজনৈতিক পথচলা শুরু, সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান। ২৫৫ ভোট পেয়ে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে আগামী পাঁচ বছর তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন কি না—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।



