যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ রাতে সারা দেশে পালিত হবে পবিত্র লাইলাতুল বারাআত বা শবেবরাত। এ উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, হামদ-না’ত, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
মাগরিবের নামাজের পর ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে বায়তুল মোকাররমে শবেবরাতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে লাইলাতুল বারাআতের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে ওয়াজ করবেন ঢাকার বাদামতলী শাহজাদা লেন জামে মসজিদের খতিব মুফতি মাওলানা নজরুল ইসলাম কাসেমী।
রাত ৮টা ৩০ মিনিটে লাইলাতুল বারাআতের শিক্ষা, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে আলোচনা করবেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আফম খালিদ হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) আ. ছালাম খান। নফল ইবাদত ও জিকির-আজকারের জন্য বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ সারা রাত মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ফজরের নামাজের পর আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শবেবরাতের অনুষ্ঠানমালা শেষ হবে। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান।
পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়সমূহ, ইসলামিক মিশন কেন্দ্র এবং ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতেও অনুরূপ আলোচনা সভা, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় কিছু সময় ও কিছু রাত রয়েছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আধ্যাত্মিকভাবে মানুষের জীবনপ্রবাহকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শাবানের পনেরোতম রজনি, যা ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত, তেমনই এক তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত রাত। এটি রহমত ও মাগফিরাতের প্রতীক, একই সঙ্গে আত্মসমালোচনা ও তাকদির সংশোধনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
‘বরাত’ শব্দটি আরবি ‘বারাআহ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মুক্তি বা দায়মুক্তি। এই অর্থে শবেবরাত হলো গুনাহ থেকে মুক্তি, জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের রাত। যুগে যুগে মুসলিম মনীষীরা এই রাতকে নৈতিক ও আত্মিক সংস্কারের এক বিশেষ সময় হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। হাদিস শরিফে শবেবরাতের ফজিলত সুপ্রতিষ্ঠিত।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাতে সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ বহু আলেমের মতে, এ রাতে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের জীবন-মৃত্যু, রিজিক এবং সুখ-দুঃখের বিষয়গুলো ফেরেশতাদের কাছে অর্পিত হয়। যদিও চূড়ান্ত তাকদির আল্লাহর জ্ঞানেই সংরক্ষিত, তবুও দোয়া ও তওবার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করতে পারে—এটাই ইসলামের আশাবাদী দর্শন।
এই রজনির মূল আমল হলো বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া, তওবা ও কান্নাভেজা মোনাজাতে রত থাকা। শবেবরাতের রাতে নফল ইবাদতে মশগুল থাকা এবং পরদিন নফল রোজা রাখা গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে শবেবরাত উপলক্ষে শরিয়তসম্মত আমল ও লোকাচারভিত্তিক চর্চার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা জরুরি।
আতশবাজি, আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দে আনন্দ প্রকাশ কিংবা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক নামাজ আদায়ের কোনো ভিত্তি কুরআন ও হাদিসে নেই। বরং এসব কর্মকাণ্ড এই রাতের শান্ত, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও আত্মিক পরিবেশকে ব্যাহত করে। শবেবরাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম কেবল আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম নয়, বরং অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মজিজ্ঞাসার ধর্ম।



