আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ঘোষিত এ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দুর্বল করাই এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আদালতের তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আইসিসি।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে থাকে। আদালতটির কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তি দীর্ঘদিনের। এর আগে আইসিসির কয়েকজন কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার সরাসরি আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেবেন না। এ কারণেই আজ যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। আমরা এই অবাধ্য আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব, তাদের সম্পদপ্রাপ্তি বন্ধ করব এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা পঙ্গু করে দেব।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতটির অতীত তদন্ত নিয়েও ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। যদিও আইসিসি জানিয়েছে, ওই তদন্তকে বর্তমানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।
বিশ্বের ১২৫টি দেশ আইসিসির সদস্য। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্যদেশ রয়েছে। ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া অন্য দেশগুলোও আদালতটির সদস্য। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিসি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছু লেনদেনে ছাড়
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চারটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করে। এর আওতায় আইসিসির টেলিযোগাযোগ ও সফটওয়্যার ব্যবহার, পেনশন পরিশোধ এবং আদালতে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিমা সেবা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সেসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন আবারও আদালতটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
এবার সরাসরি আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে—এমন আশঙ্কায় আদালত কর্তৃপক্ষ কয়েক মাস ধরে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর অংশ হিসেবে দপ্তরের কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে উন্মুক্ত উৎসের বিকল্প সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিল চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানান। এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইসিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মিত্রদেরও আহ্বান রুবিওর
মার্কো রুবিও বলেন, আইসিসি এবং আদালত প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনের সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে বিলম্ব করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
রুবিও বলেন, ‘হয় আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসিকে বন্ধ করে দেব। আমরা আশা করি, আমাদের মিত্ররা—যাদের অনেকেই আইসিসির সদস্য এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সেনাদের ওপর নির্ভরশীল—আদালটিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।’
তিনি আরও বলেন, আইসিসির সদস্যদেশগুলো যাতে আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করতে পারে, সে সুযোগ রেখেই নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ সফল না হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাইয়ের সঙ্গে আইসিসির সম্পৃক্ততা
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুক্রবার আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন এ পুরস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছে তারা।
কমিটির ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত।
সূত্র: রয়টার্স



