tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ

ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে পুলিশ। মেট্রোরেল ও দিল্লিগামী ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের পর এবার জনপথ ও কর্তব্যপথের সংযোগস্থল থেকে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এনডিটিভি ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশ জারি করা হয়। নির্দেশটি এয়ারটেল, ভোডাফোন-আইডিয়া, জিও ও এমটিএনএলসহ সংশ্লিষ্ট টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত ১০টা পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকায় সব ধরনের প্রযুক্তির মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০২৪ সালের টেলিযোগাযোগ পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিধিমালার ৩ নম্বর বিধির উপবিধি ১ এবং ২০২৩ সালের টেলিযোগাযোগ আইনের ২০ নম্বর ধারার ২(খ) উপধারার আওতায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবের অনুমোদনক্রমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইন্টারনেট বন্ধের আওতায় থাকছে দিল্লির কনট প্লেস, মান্ডি হাউস, প্রগতি ময়দান, গুরুদ্বার বাংলা সাহিব, বারাখাম্বা রোড, খান মার্কেট, লোধি রোড ও জঙ্গপুরার কিছু অংশ কিংবা পুরো এলাকা।

এর আগে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব স্টেশনের মধ্যে ছিল রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেট। পরে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) স্টেশন বন্ধের তালিকা সংশোধন করে ৫৭টি থেকে কমিয়ে ৪৫টি করে।

এ ছাড়া শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য থেকে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন ৬০টির বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপত্তি

বিক্ষোভ ঘিরে গণপরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার দিল্লি মেট্রো ও ট্রেন চলাচল বন্ধের বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনের শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। আদালতের ভাষায়, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না।’

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া যায় না। তরুণ থেকে বয়স্ক—বিভিন্ন বয়সের মানুষ প্রতিদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। সাধারণ মানুষের মৌলিক পরিষেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো পরিষেবার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং সেটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

আদালত আরও বলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সীমিত করারও সুযোগ রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষকে যাতায়াতের বিকল্পহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হবে।

শুনানিতে ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।

আদালতের আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এসব পদক্ষেপের ফলে জরুরি গণপরিবহন পরিষেবার ওপরও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মেট্রো ও অন্যান্য ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলের সুযোগ রাখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করে।

এরপর সলিসিটর জেনারেল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিধিনিষেধগুলো পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাতে সম্মত হন।

আগেও বিক্ষোভে ইন্টারনেট বন্ধের নজির

দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে জুলাই মাসে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে জন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভের সময়ও কয়েক দিন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

ওই সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তরুণ বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি আন্দোলনের খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকদেরও সমস্যায় পড়তে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশে বাধার সৃষ্টি হয়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশেও বিলম্ব ঘটে।

আগেরবার ইন্টারনেট বন্ধের আওতা ছিল দেড় কিলোমিটার এলাকায়। এবার তা বাড়িয়ে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধে নেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ এবং সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।