মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সরাসরি সম্প্রচার নিউজিল্যান্ডের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা দেখলে তা বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা দেশটির জাতীয় সেন্সর কর্তৃপক্ষের নেই। স্থানীয় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নিউজিল্যান্ডের জাতীয় সেন্সর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানাতে বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বানের মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এলো।
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জনকে হত্যা ও ৩২ জনকে আহত করার ঘটনায় সাবেক সেনা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিদাল হাসানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওই মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
পেন্টাগন বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে এবং সেই পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য এভাবে লাইভ সম্প্রচারের ঘটনা হবে নজিরবিহীন।
বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষায় যখন বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে নতুন সমালোচনার জন্ম দিতে পারে।
এ বিষয়ে প্রথম দিকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড। দেশটির স্বাধীন সরকারি সংস্থা ‘ক্লাসিফিকেশন অফিস’ জানিয়েছে, কোনো লাইভ সম্প্রচারের সময় সেটিকে নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিতে—যেমন নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ কনটেন্ট—অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনি ও বাস্তবিক জটিলতা রয়েছে।
এক বিবৃতিতে নিউজিল্যান্ডের সেন্সর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র বলেন, কোনো অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ার সময় সেটিকে আগেভাগে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ শ্রেণির কনটেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে কোনো লাইভস্ট্রিম অনুষ্ঠান দেখা বা সেটিতে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ক্ষমতাও তাদের কিংবা অন্য কোনো সংস্থার নেই।
দেশটির সেন্সর কর্তৃপক্ষের প্রধান ক্যারোলিন ফ্লোরা বলেন, নিউজিল্যান্ডের আইনে কোনো কনটেন্ট নিষিদ্ধ করার জন্য কঠোর মানদণ্ড রয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
তার ভাষ্য, কোনো বিষয়বস্তু অত্যন্ত পীড়াদায়ক হলেও তা সব ক্ষেত্রে বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হবে—এমন নয়। পাশাপাশি কোনো ঘটনা বা কনটেন্ট বাস্তবে প্রকাশের আগে সেটি কী ধরনের শ্রেণিবিভাগের আওতায় পড়বে, সে বিষয়ে আগাম মন্তব্য করাও সম্ভব নয়।
ফ্লোরা জানান, বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া গেলে নেটসেফের মতো অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য নিউজিল্যান্ড সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ক্রাইস্টচার্চ হামলার কারণে বাড়তি গুরুত্ব
নিউজিল্যান্ডের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালে দেশটির দুটি মসজিদে এক বন্দুকধারীর হামলায় ৫১ জন নিহত হন। ওই হামলার দৃশ্য ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেছিলেন হামলাকারী।
এর পর থেকেই অনলাইনে সহিংস ও ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে নিউজিল্যান্ড। হামলার কয়েক মাস পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন অনলাইনে সহিংস কনটেন্ট মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক উদ্যোগও শুরু করেছিলেন।
জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সমালোচনা
বিশ্বে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বর্তমানে অত্যন্ত বিরল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান এবং তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানের মতো দেশে এ ধরনের ঘটনা দেখা গেছে।
নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনারও সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির ক্যাম্পেইন ম্যানেজার কিনজোম ধংডু বলেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসমক্ষে সরাসরি প্রচারের পরিকল্পনা মানুষের মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননা। রাষ্ট্রের অনুমোদনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে জনসমক্ষে প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত করা মৃত্যুদণ্ডের নিষ্ঠুরতাকে আরও তীব্র করে তোলে।



