কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নতুন কৌশলে সংগঠিত হয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের ভাষ্য, অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে ছোট পরিসরে ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এসব ঘটনাকে সম্ভাব্য বড় ধরনের নাশকতার আগে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিছিল, স্লোগান, ভিডিও ধারণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ছে একটি অংশ। পরে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কে এমন একটি ঘটনার কথা জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে বাটা শোরুমের সামনে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের ব্যানার, যাতে পলাতক সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের ছবি ছিল। কয়েক সেকেন্ড স্লোগান দেওয়ার পর সেখানে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করেন এক ব্যক্তি। এরপর অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করেছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সময়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো মিছিল ও বিস্ফোরণের ঘটনা ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ করা হচ্ছে। প্রথমে কয়েকজন ব্যানার নিয়ে নির্দিষ্ট স্থান থেকে বের হয়ে রাস্তায় জড়ো হন। এরপর স্লোগান ও ভিডিও ধারণ করা হয়। শেষ পর্যায়ে ব্যানার ফেলে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন তারা।
সূত্রগুলোর দাবি, ঘটনাস্থলে ভিডিও ধারণের জন্য আগে থেকেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া থাকে। পরে এসব ভিডিও বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের পরিচালিত বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে পাঠানোর তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। একই কৌশলে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েও দ্রুত ঘটনাস্থল ছাড়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক সপ্তাহে একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, গত এক সপ্তাহে রাজধানীর সুপ্রিম কোর্টের ফটক, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর রেলস্টেশন, মগবাজার, মৎস্য ভবন মোড়, রামপুরা বিটিভি ভবন, কাফরুল থানার সামনে, মিরপুর-১১, মধ্য বাড্ডা ও পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে।
তাদের হিসাবে, এসব এলাকায় ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ, নয়টি বাসে আগুন এবং কমলাপুরে একটি ট্রেনে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ হাজার মুখোশ ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের ঘটনা বেড়েছে। শুক্রবার রাতেও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গভীর রাতে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই যুবক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত চলে যায়।
তিন স্তরে অবস্থানের দাবি গোয়েন্দাদের
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় তিন স্তরে অবস্থান নিয়েছে।
প্রথম স্তরে রয়েছে মেস ও ছাত্রাবাস। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, উত্তরা ও গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় মেস, ছাত্রাবাস ও ব্যাচেলর বাসায় তৃণমূলের কিছু কর্মী অবস্থান করছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের কেউ ছাত্র, কেউ চাকরিপ্রত্যাশী আবার কেউ ছোটখাটো চাকরিজীবীর পরিচয়ে থাকছে বলে সূত্রের ভাষ্য।
প্রতি মেসে কয়েকজন করে অবস্থান করে মাঠপর্যায়ে জনবল সরবরাহ, ককটেল বহনসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের। আটক কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও সূত্রের দাবি। তাদের কাছে বিভিন্ন নির্দেশনা গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে পৌঁছায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ভাড়া বাসা। গোয়েন্দাদের মতে, এই পর্যায়ে মাঝারি সারির নেতা, সাবেক কাউন্সিলর এবং যুবলীগ ও ছাত্রলীগের থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা অবস্থান করছেন। স্বামী-স্ত্রী বা ব্যাচেলর পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
খিলগাঁও, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় এমন অন্তত ৩০টি বাসার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। তাদের দাবি, কোথায় মিছিল হবে, কারা অংশ নেবে, কে ককটেল বহন করবে এবং কে ভিডিও ধারণ করবে—এসব বিষয়ে এখান থেকেই সমন্বয় করা হয়।
তৃতীয় স্তরে রয়েছে হোটেল, ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। গোয়েন্দাদের দাবি, এই পর্যায়ে অর্থদাতা, সমন্বয়কারী এবং বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারীরা অবস্থান করেন। গুলশান, বনানী ও উত্তরার কিছু আবাসিক হোটেলে তাদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি। নিরাপত্তার কারণে তারা নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করেন বলেও জানানো হয়েছে।
ভিডিও পাঠালে অর্থ পাওয়ার দাবি
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, আটক এক কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদে ভিডিও পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের পরিচালিত একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ককটেল বিস্ফোরণ বা নাশকতার ভিডিও পাঠালে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো বলে ওই ব্যক্তির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাবেক ঠিকাদার, পরিবহন ব্যবসায়ী, বাজার কমিটির নেতা ও ব্যাংক খাতের সুবিধাভোগী কয়েকজন ব্যবসায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছেন। তাদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে সূত্রের দাবি।
পুলিশি নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে রাজধানীতে ধারাবাহিক ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও আগাম তথ্য সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের গতিবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত আগাম তথ্য না পাওয়ায় কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চাপে পড়তে হয়েছে।
এরই মধ্যে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও অপারেশনাল পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্রাইম বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগেও রদবদল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গতিবিধি ও যোগাযোগের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
বিদেশে থাকা নেতাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের সোর্স নেটওয়ার্ক আরও সক্রিয় করেছে বলেও সূত্রের দাবি। বিদেশে পলাতক অর্ধশত কেন্দ্রীয় নেতাকে নজরদারিতে রাখার তথ্যও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য
সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাকে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আত্মগোপনে থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা ও নাশকতায় অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
যাত্রাবাড়ীতে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার বংশালের রায়হান উদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদে তার রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নাম বলেছেন বলে পুলিশের দাবি। ভারতীয় একটি নম্বর থেকে নির্দেশনা পাওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন বলে সূত্রের ভাষ্য।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় গ্রেপ্তার মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাকিব ওরফে আসিফ বিদেশে পলাতক মতিঝিল থানা সভাপতি মিরাজ বিশ্বাসের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন—এমন দাবি করেছে গোয়েন্দা সূত্র।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা আত্মগোপনে গেলেও তাদের সাংগঠনিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় উৎসাহিত করার তথ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দারা দাবি করছেন।
নাশকতার অর্থায়ন ঠেকাতে ডিবির বিভিন্ন বিভাগকে অর্থদাতাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
ঘন ঘন বদলিতে সমন্বয়ে সমস্যা
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, পুলিশের ঘন ঘন বদলিও মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), ডিএমপির ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তা এবং ডিবির কর্মকর্তাদের রদবদল হয়েছে। ফলে নতুন দায়িত্ব নেওয়া কর্মকর্তাদের স্থানীয় সোর্স ও অপরাধীদের গতিবিধি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে সময় লাগছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নাশকতা ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত এক সপ্তাহে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্যালয় থেকে কয়েক শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে যাচাই-বাছাই করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



