আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে পোস্টাল ভোট। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ইতোমধ্যে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন।
নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়া এসব ভোটারের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর কাজ শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আশা করছে, নিবন্ধনকারী প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ ক্যাটাগরিতে নিবন্ধন করেছেন আরও ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন ভোটার। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের কাছেও পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হবে। ইসির কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, দেশের ভেতরের নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যেও ৯০ শতাংশের বেশি ভোট দেবেন।
এই প্রেক্ষাপটে পোস্টাল ভোট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। ইসির ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব আসনে ৫ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট পড়বে, সেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই ভোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিবন্ধন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৮১টি আসনে ৪ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি আসনে ১০ হাজারের বেশি, ৯টি আসনে ৯ হাজারের বেশি, ১০টি আসনে ৮ হাজারের বেশি, ১১টি আসনে ৭ হাজারের বেশি এবং ২১টি আসনে ৬ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছেন। পাশাপাশি ৪৬টি আসনে ৫ হাজারের বেশি এবং ৬৬টি আসনে ৪ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ১১৬টি আসনে ৫ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট পড়তে পারে।
আসন ও জেলাভিত্তিক চিত্র
আসনভিত্তিক নিবন্ধনে শীর্ষে রয়েছে ফেনী-৩ আসন, যেখানে ১৬ হাজার ৯৩ জন ভোটার পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ আসন, সেখানে নিবন্ধন করেছেন ১৪ হাজার ৩০১ জন।
জেলাভিত্তিক হিসাবে কুমিল্লা রয়েছে শীর্ষে—এ জেলায় ১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন ভোটার পোস্টাল ভোটে নিবন্ধিত। এরপর ঢাকা জেলায় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫৫ জন এবং চট্টগ্রামে ৯৫ হাজার ২৯৭ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন।
আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বাসসকে বলেন, “ফেনী-৩ আসনে ১৬ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। একটি আসনে ৫ হাজার ভোটই ফলাফল বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম পোস্টাল ভোট চালু হয়েছে এবং এতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।”
তিনি আরও জানান, প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী ভোটার সঠিক ঠিকানা না দেওয়ায় তাদের কাছে ব্যালট পাঠানো সম্ভব হয়নি। বাকিদের কাছে দ্রুত ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরের ভোটারদের ক্ষেত্রে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর ব্যালট পাঠানো হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটের ক্ষেত্রে ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আসা—এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৭ দিন সময় লাগতে পারে।
গোপনীয়তা ও সতর্কতা
পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্পূর্ণভাবে ভোটারের দায়িত্ব। এই গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেন সালীম আহমাদ খান।
ভোট দেওয়ার নিয়ম
ইসির পরিপত্র অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে সব প্রতীক মুদ্রিত থাকবে। ভোট দেওয়ার আগে ভোটারকে নির্দেশনাপত্র পড়ে ঘোষণাপত্রে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর, নিজের নাম ও এনআইডি নম্বর লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। ঘোষণাপত্র ছাড়া ব্যালট গ্রহণযোগ্য হবে না।
নিরক্ষর বা শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটাররা অন্য একজন বৈধ ভোটারের সহায়তায় ফরম-৮ পূরণ ও সত্যায়ন করতে পারবেন।
প্রতীক বরাদ্দের পর ভোটাররা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে লগইন করে নিজ আসনের প্রার্থীদের তালিকা দেখতে পাবেন এবং প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘরে টিক বা ক্রস চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন। এ বিষয়ে অ্যাপে ভিডিও টিউটোরিয়াল ও ডিজিটাল কনটেন্টও থাকবে।
ভোট দেওয়ার পর ব্যালটটি ছোট খামে ভরে বন্ধ করতে হবে। এরপর সেই খাম ও স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্র একটি বড় খামে ভরে রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠাতে হবে। এই খাম পাঠাতে ভোটারদের কোনো ডাক মাশুল দিতে হবে না; সম্পূর্ণ খরচ সরকার বহন করবে।
গণনা ও পর্যবেক্ষণ
ভোট গণনা শুরুর আগ পর্যন্ত প্রাপ্ত সব পোস্টাল ব্যালট গণনার আওতায় আসবে। ভোটাররা অ্যাপের মাধ্যমে তাদের ব্যালটের অবস্থান ট্র্যাক করতে পারবেন। রিটার্নিং অফিসার ব্যালট গ্রহণের পর কিউআর কোড স্ক্যান করে তা রেকর্ড করবেন এবং সফটওয়্যার থেকে ফরম-১২ তৈরি করে স্বাক্ষর করবেন।
গণনার সময় ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর না থাকলে ব্যালট বাতিল হবে। গণনার জন্য রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে আলাদা কক্ষ থাকবে, যেখানে প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। সফটওয়্যারের মাধ্যমে পোস্টাল ভোটের সামগ্রিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করা যাবে।



