উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে বোরো ধান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। গত দুইদিনে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে নেমে আসা ঢলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় টানা বৃষ্টি। এতে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা-সহ বিভিন্ন হাওরের নিচু জমির ধানক্ষেত দ্রুত তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে পানির প্রবেশ
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে লাখো কৃষক এখন উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে জেলার দুইটি বাঁধ ভেঙে এবং একটি বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার সকালে মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া এলাকায় ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ এবং সদর উপজেলার দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এসব বাঁধ তাদের আওতাভুক্ত নয়। একই দিনে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণ বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করে, ফলে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুরমা নদীর পানি ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী দুইদিন আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
হাওরের কৃষকেরা ধান কাটায় এখন হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভর করলেও অনেক জায়গায় পানি জমে থাকায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধিতে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
মধ্যনগরে গ্রামীণ সড়ক ভেঙে পানি প্রবেশ
মধ্যনগরে মনাই নদীর পানি চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় হামিদপুর গ্রামের পাশের একটি গ্রামীণ সড়ক ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ওই হাওরে মোট ১১৪ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ৪০ হেক্টর ধান ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ধান কাটা শেষ হলেও কিছু জমি ঝুঁকিতে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জে কাটা ধান নিয়েও সংকট
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও টানা বৃষ্টিতে ফসল ডুবে যাওয়ায় কৃষকেরা চরম ক্ষতির মুখে। ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীতে কাটা ধান শুকানো ও মাড়াই নিয়েও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। কর্দমাক্ত মেঠোপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ধান ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা।
প্রতিদিনই মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনুসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়ছে, ফলে অন্তত ৩০টির বেশি হাওরের দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
দোয়ারাবাজারে শ্রমিক সংকট ও অকাল কাটার ঝুঁকি
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির কারণে ধান কাটায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন, যদিও এতে ফলন ও মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেত্রকোণায় নদীর পানি বৃদ্ধি, বাঁধে চাপ
নেত্রকোণায় ধনু, কংস, সোমেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের ফসল নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেশ কিছু হাওরের ধান এখন পরিপক্ব হলেও পানি ও শ্রমিক সংকটে তা কাটা সম্ভব হচ্ছে না। বজ্রপাত ও ঝড়বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা মাঠে নামতেও ভয় পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের সতর্কতা
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে শত শত হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং দ্রুত ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
হাওরের কৃষকদের কাছে এটি এখন বাঁচা-মরার লড়াই—ফসল ঘরে তোলা না গেলে বছরের পুরো পরিশ্রমই ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।



