অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে বেসরকারি শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাপ্য অর্থ তাঁদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে সরকার।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অবসর সুবিধা বোর্ড ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত এক লাখের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকা ২০২২ সালের পর দীর্ঘ চার বছর পর সরকারি দুটি তহবিল থেকে তাঁদের জমা করা অর্থের একটি অংশ ফেরত পেয়েছেন বা পেতে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই দুটি তহবিলের একটি হলো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অন্যটি অবসর সুবিধা বোর্ড। দুটি তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার মাধ্যমে ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকার জীবনে কিছুটা হলেও আর্থিক অনিশ্চয়তার অবসান হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষক এই সুবিধা পাচ্ছেন।
খালেদা জিয়ার উদ্যোগের কথা স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণে তাঁর উদ্যোগেই ১৯৯১ সালে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর উদ্যোগেই ২০০২ সালে অবসর সুবিধা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়।
তারেক রহমান বলেন, শুরুতে এই তহবিলে সরকারি ফান্ড থেকে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে ৮৯ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে এর ভিত্তি সুদৃঢ় করা হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খালেদা জিয়ার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বিশেষ করে নারীদের একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ ও ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
শিক্ষা বিস্তারে খালেদা জিয়ার চালু করা শিক্ষা উপবৃত্তি এবং নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ বিভিন্ন দেশে মডেল হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি মরহুমা খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনা করেন।
অবসরকালীন সুবিধা পেতে হয়রানির অবসান
দুটি তহবিলের কার্যক্রম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত এসব তহবিলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রতি মাসে অর্থ জমা দেন। পাশাপাশি সরকারও প্রতিটি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে অর্থ জমা দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার সময় শিক্ষক-শিক্ষিকারা যেন একটি উল্লেখযোগ্য অর্থ হাতে পান।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অবসর গ্রহণের পর নিজেদের প্রাপ্য অর্থ তুলতে গিয়ে শিক্ষকদের নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে শিক্ষকদের ঘুষ দেওয়ার অলিখিত নিয়মও পালন করতে হয়েছে বা বাধ্য হতে হয়েছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজ নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়ে লাখো শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলেন। সেই শিক্ষকদেরই যদি নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয় কিংবা অফিসে অফিসে ঘুরতে হয়, তাহলে এটি শুধু শিক্ষকদের হয়রানি নয়; জাতি হিসেবে আমাদের দীনতাও প্রকাশ করে।
দুটি তহবিলকে প্রায় দেউলিয়া করার অভিযোগ
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পতিত সরকারের আমলে ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন খাতে লুটপাটের কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্বার্থে গঠিত দুটি তহবিলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, জাল ইন্ডেক্স তৈরি, লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করতে শিক্ষক কল্যাণ তহবিলের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল।
এর ফলে সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়ানো শিক্ষকরা জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা ২০২২ সাল থেকে এসব তহবিল থেকে কোনো অর্থ পাচ্ছিলেন না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের অবসরকালীন সুবিধার অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ৭০ হাজারের বেশি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে।
অনলাইনে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
ভবিষ্যতে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার যতদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, ততদিন অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে শিক্ষকদের যেন অফিসে অফিসে ঘুরতে না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
অবসর নিলেও শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয় না
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যা অন্য সব পেশার মানুষ তৈরি করে। একজন শিক্ষক অবসর গ্রহণ করলেও তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এখানেই একজন শিক্ষকের সার্থকতা।
তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়মে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিলেও শিক্ষক হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা এখনো সমাজের শিক্ষক।
বাংলাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় শিক্ষক সমাজের ভূমিকা এখনো সর্বজনগ্রাহ্য উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষকরা সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন—এটাই প্রত্যাশা।



