সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর নাগরিকত্ব ও স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করা হয়। এ জন্য নিয়োগপ্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা জানতে চাওয়া এবং পুলিশি যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই ঠিকানার সত্যতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও রয়েছে। তবে স্থায়ী ঠিকানায় নিজের নামে জমি বা বাড়ি না থাকলেই কোনো প্রার্থী সরকারি চাকরির জন্য অযোগ্য হয়ে যাবেন—এমন কোনো সাধারণ আইনি শর্ত নেই।
সম্প্রতি একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের পৈতৃক ভিটেমাটি নেই। কেউ নদীভাঙনে জমি হারিয়েছেন, কেউ ভূমিহীন। আবার অনেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে নিজেদের আদি ঠিকানায় বসবাস করেন না। জীবিকার প্রয়োজনে শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন অনেকে। ফলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ জটিলতার মুখে পড়েন।
সম্প্রতি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মিশন আচার্য। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশও পান। তবে নিজেদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় তার নিয়োগপত্র পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রশাসন তা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়। গত রোববার নিজস্ব ভিটেবাড়ি না থাকা মিশন আচার্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
এই ঘটনার পরই প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণ করতে কি নিজের নামে জমি বা বাড়ি থাকা বাধ্যতামূলক? নাকি স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা যাচাই করাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট?
সংবিধানে কী বলা আছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’
একই অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ কিংবা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিককে নিয়োগের ক্ষেত্রে অযোগ্য করা বা বৈষম্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
নিজের সম্পত্তি থাকা কি বাধ্যতামূলক?
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য প্রার্থীর নিজের নামে বাড়ি বা জমি থাকা কোনো সাধারণ আবশ্যিক যোগ্যতা নয়।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগের মূল ভিত্তি হচ্ছে মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা।’
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা বা নিজ জেলার তথ্য এবং তার প্রমাণ চাওয়া যেতে পারে। তবে ‘স্থায়ী ঠিকানা’ থাকা এবং ‘নিজের মালিকানাধীন বাড়ি’ থাকা একই বিষয় নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘ফলে কেবল নিজের বাড়ি বা জমি নেই—এই কারণে অন্য সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রার্থীকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হলে, বিশেষ কোনো আইনে বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে এর সুস্পষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি না থাকলে, তা সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদের আলোকে বৈষম্যমূলক ও আইনগতভাবে প্রশ্নযোগ্য।’
স্থায়ী ঠিকানা বনাম সম্পত্তির মালিকানা
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা থাকতে পারে, যদিও সেই ঠিকানায় তার নিজের নামে কোনো জমি বা বাড়ি নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণের বিষয়টি সম্পত্তির মালিকানার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই।
একজন ব্যক্তি পৈতৃক সম্পত্তি হারাতে পারেন, নদীভাঙনে বসতভিটা বিলীন হতে পারে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে অন্যের জমিতে বসবাস করতে পারেন। আবার জীবিকার প্রয়োজনে কেউ নিজ জেলার বাইরে থাকলেও তার স্থায়ী ঠিকানা অন্যত্র হতে পারে। এসব পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই সম্পত্তির মালিকানা ও স্থায়ী ঠিকানার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।
তাই সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলেও শুধু ওই ঠিকানায় তার নিজের নামে বাড়ি বা জমি আছে কি না, সেটিকে সাধারণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনার প্রশ্ন আলাদা।
তবে নিয়োগবিধির বিশেষ শর্ত থাকলে?
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সব সরকারি চাকরির নিয়োগের শর্ত এক নয়। কোনো নির্দিষ্ট পদ বা নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, নিয়োগবিধি বা বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষ কোনো যোগ্যতা বা শর্ত উল্লেখ থাকলে সেটি আলাদাভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।
অর্থাৎ কোনো পদে প্রার্থীকে নির্দিষ্ট জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে বলা হলে সেই শর্ত পূরণের প্রমাণ দিতে হতে পারে। কিন্তু স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার অর্থই নিজের নামে ওই এলাকায় জমি বা বাড়ির মালিক হওয়া—এমন ধারণা সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়।
সব মিলিয়ে, সরকারি চাকরির জন্য স্থায়ী ঠিকানা যাচাই এবং নিজের নামে বাড়ি-জমির মালিকানা—এ দুটি পৃথক বিষয়। কোনো প্রার্থীর নিজের নামে ভিটেবাড়ি বা জমি না থাকলেই তিনি সরকারি চাকরির জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য হয়ে যাবেন—এমন সাধারণ আইনি বিধান নেই। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে নির্দিষ্ট কোনো শর্ত থাকলে সেটি অবশ্যই পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।



