বিএনপির মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, শহীদ আবরার ফাহাদের আত্মদান গোটা জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের শক্তি আরও সংগঠিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অডিটোরিয়ামে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি: আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা সুরক্ষার অঙ্গীকার’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় রিজভী বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পর ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের ব্যর্থতায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসের মধ্যে একটি দেশ পড়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে নিষ্কৃতি পাব কি না—এই ধরনের আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন আর আমরা দেখতে পারছিলাম না। যখন দিনের পর দিন প্রত্যেকটি আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছে, আন্দোলনের কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অনেক সময় মনে হয়েছে আমরা একটার পর একটা আন্দোলন করছি, কিন্তু ফল পাচ্ছি না।’
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘আমি পার্শ্ববর্তী দেশে যা দিয়েছি, সেটা মনে রাখবে’—এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে দেশ বিক্রি, সার্বভৌমত্ব দুর্বল করা ও স্বাধীনতা বিসর্জনের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘কী দিয়েছে, যে তারা মনে রাখবে? এই কথার মধ্যে যে দেশ বিক্রি করা, সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করা এবং স্বাধীনতা বিক্রি করার যে মন্ত্র, সেই কথার অন্তর্নিহিত সুর হচ্ছে—আমার ভূখণ্ড, আমার পায়ের নিচে যে মাটি, সেটি আর নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলেও ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের সময় এসব প্রতিষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যায় বলে মন্তব্য করেন রিজভী।
তিনি বলেন, ‘যখন ফ্যাসিজম, যখন নাৎসিবাদ চেপে বসে, তখন তারা সব জায়গাগুলোকে আত্মস্থ করে। সব জায়গার ওপর তাদের কামড় দেয়। সব জায়গা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। কোথাও থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। যেটা আমরা জার্মানিতে দেখেছি, যেটা আমরা ইতালিতে দেখেছি।’
আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘যখন আমরা আবরারের এই কাহিনি শুনলাম, এই মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনা যখন ঘটল, তখন এটা মানুষের মধ্যে তরঙ্গ তৈরি করেছে।’
লিও টলস্টয়ের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘তুমি যখন অন্য মানুষের ব্যথা-বেদনাটা অনুভব কর, তখন তুমি মানব প্রজাতি, তখন তোমার মধ্যে মানবীয় অস্তিত্ব আছে।’ তার ভাষায়, আবরারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা গোটা জাতি যেভাবে অনুভব করেছে, সেটিই মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
রিজভী বলেন, দীর্ঘদিনের গুম, খুন, বিচারহীনতা ও নানা ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় মানুষ যখন হতাশ হয়ে পড়েছিল, তখন আবরারের দেশপ্রেমিক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে হত্যার ঘটনা জাতিকে নাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেন, ‘এত বড় অন্যায়, এত অত্যাচার, এত গুম, এত খুন, এত বিচারহীন হত্যা—তারপরও কারও দিকে আঙুল উঠছে না। কিন্তু আবরারের এই দেশপ্রেমিক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে যে নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, গোটা জাতি যেভাবে কেঁদে উঠেছে, গোটা জাতি যেভাবে জাগ্রত হয়েছে, গোটা জাতি যেভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছে প্রতিরোধের জন্য—এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত।’
আবরারের আত্মদান শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনেও প্রভাব ফেলেছে দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এই জাতির অন্তরের মধ্যে, এর রক্তের তলদেশে লৌহকঠিনভাবে প্রোথিত হচ্ছে যে মৃত্যু-স্রোত, সে স্রোত শেখ হাসিনা আটকাতে পারেননি। এবং আটকাতে পারেননি বলেই আবরারের এই মৃত্যু, তার এই শহীদ আত্মদান—সেখানে একটি চূড়ান্ত করণ হচ্ছে ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার দেশ থেকে পড়ায়।’
ছাত্রদলের আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসার জন্য কখনো ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে, কখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যেতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, হামলা-নির্যাতনের পরও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্তা বিসর্জন দেননি। এর পেছনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনৈতিক ধারার প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার যে আপসহীন ধারা, সেই ধারা হচ্ছে—তুমি কোনো আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নেবে না। তুমি যা, তাই নিয়ে তুমি লড়াই কর। তুমি তাই নিয়েই তোমার রাজনীতি কর।’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, জনগণের রায় দেওয়ার মতো অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ এবং একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে জনগণ জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষেই রায় দিয়েছে।
আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, তাকে আক্রমণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন বক্তব্য দেওয়ার সাহস না করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
রিজভী বলেন, ‘আবরারকে যখন আক্রমণ করা হয়েছে, তাকে যখন হত্যা করা হচ্ছে, তখন এটা বুঝতে হবে—এটা ভয়ঙ্কর রকম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, যে এরকম একটা কথা লিখলেই তার জীবন অবসান ঘটবে এবং আর কেউ সাহস করবে না। কিন্তু তারা এই ভুল বার্তা পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বরং তার মৃত্যু এবং তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে গোটা জাতিকে আরও বেশি সংগঠিত করেছে। আর আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে, সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের যে প্রতিরোধের শক্তি, সেই শক্তির স্ফুলিঙ্গ।’
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আবরার ফাহাদের পিতা মো. বরকত উল্লাহ। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।



