tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়জ্বালানির দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ

জ্বালানির দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ

বাড়ছে চাল-ডাল-তেল-ডিমের দাম

উচ্চ দামে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে নতুন করে বেড়েছে চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, দুধসহ বিভিন্ন সবজির দাম। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে বলে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজারদরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এতদিন পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহ সংকটের কথা বলে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। এবার তাদের নতুন যুক্তি—জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, পরিবহন ভাড়া বাড়ার অজুহাতে পণ্যের দাম যৌক্তিক হারের চেয়ে বেশি বাড়ানো হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, জ্বালানির দাম বাড়লেই তার চেয়ে বেশি হারে প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া যেন বাজারে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারাও দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করছেন।

টিসিবির এক মাসের পণ্যমূল্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেজিপ্রতি মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সরু চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে। আটা-ময়দার ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে আরও বেশি। এক মাসে প্যাকেট আটার দাম ৮ শতাংশ এবং প্যাকেট ময়দার দাম ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খোলা আটার দাম ২ শতাংশ এবং খোলা ময়দার দাম ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও দেখা গেছে মূল্যবৃদ্ধি। এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২ দশমিক ৫১ শতাংশ, দুই লিটারের বোতলে ৩ শতাংশ এবং পাঁচ লিটারের বোতলে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দামও লিটারে ১ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম ২ শতাংশ বেড়েছে।

ডালের বাজারেও একই চিত্র। বড় দানা মসুর ডালের দাম কেজিতে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। ছোলার দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাশাপাশি ডিমের দাম হালিতে বেড়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। কাঁচাবাজারে বেগুন, শসা ও কাঁচামরিচসহ কয়েকটি সবজির দামও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপণ্য

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মের বাদামি ডিমের দাম হালিতে ৫ টাকা বেড়ে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছুদিন আগেও একই ডিম বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়।

মাঝারি ও সরু চালের দাম কেজিতে বেড়েছে সর্বোচ্চ ২ টাকা পর্যন্ত। আটা ও ময়দার দামও খোলা ও প্যাকেটভেদে কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম দোকানভেদে ভিন্ন। কোথাও লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকা, আবার কোথাও ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

বড় দানা মসুর ডাল আগে সর্বনিম্ন ৯০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এখন বেশির ভাগ দোকানে তা ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে বেগুন, শিম ও করলাসহ কয়েকটি পণ্যের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। অন্য অনেক সবজির দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সুগন্ধি চালের মধ্যে পোলাও চালের দাম বেড়ে কেজিতে ২১০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটজাত পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত।

তরল দুধের দামও বেড়েছে। গত মাসে যে দুধ লিটারপ্রতি ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকায়। গরুর মাংসের দামও কিছু দোকানে বেড়েছে। এতদিন যেসব দোকানে প্রতি কেজি ৭৮০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি হতো, সেসবের কোথাও কোথাও এখন দাম ৮০০ টাকা হয়েছে। তবে মুরগি ও খাসির মাংসের দাম আপাতত অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও বিক্রেতারা বলছেন, শুক্রবারের বাজারে কিছু পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

‘আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে’

তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, বাজারে প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়ছে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, নিত্যনতুন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সীমিত আয়ের মধ্যে মাসের বাজার খরচ সামাল দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অনেক সময় হিসাব মেলাতে ধার-কর্জ করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

কদমতলী এলাকার অটোরিকশাচালক মো. হাবিব রহমান বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। দেখা যায়, দাম যতটা বাড়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যাদের আয় বেশি, তাদের হয়তো চাপ কম। কিন্তু আমাদের মতো দৈনিক গড়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করাই যাদের জন্য কঠিন, তাদের কাছে কেজিতে ২ টাকা দাম বাড়লেও অনেক চাপ বেড়ে যায়। বাজারের এই রীতি বন্ধ করা উচিত। নইলে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

‘জ্বালানির দাম ব্যবসায়ীদের নতুন অজুহাত’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনো না কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তারা এখন আরও একটি অজুহাত পেয়েছেন। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বেশ কিছু পণ্যের দামে পড়তে শুরু করেছে। এতে ভোক্তাদের ব্যয়ের চাপ ও দুর্ভোগ দুটোই বাড়ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় এতটা বাড়লে এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়বে। কারণ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব ক্ষেত্রের সঙ্গেই পরিবহন ব্যয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তবে এর সুযোগ নিয়ে বাজারে ঢালাওভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো কিংবা যৌক্তিকের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া ঠেকাতে হবে। এ জন্য বাজারে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ

তেজগাঁওয়ের ডিমের পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিমের দাম কিছুটা কমার দিকে যাওয়ার সময়ই পোলট্রি ফিডের দাম আবার বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ডিমের দাম কমার বদলে নতুন করে কিছুটা বেড়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চালের পাইকারি প্রতিষ্ঠান লাকসাম ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী মো. মোশাররফ হোসেন জানান, দীর্ঘ সময় চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে সরু ও মাঝারি চালের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি পোলাও চালের বাজারে সংকট দেখিয়ে মিলগুলো দাম বাড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিউমার্কেট বাজারে তরল দুধের একটি ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী জানান, দুধ সংগ্রহ, উৎপাদন ও পরিবহন—তিন পর্যায়েই ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে লিটারপ্রতি দুধের দাম ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতারাও বলছেন, আগাম শীতের সবজি বাজারে আসায় দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এখন পরিবহনকারীরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে, আর সেখান থেকে খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের বাস্তব চাপের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের অজুহাতে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাজার তদারকি জোরদারের দাবি উঠেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।