জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, শুধু ট্রাইব্যুনালই নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং লজিস্টিক সহায়তাও বৃদ্ধি করা হবে, যাতে বিচার কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়।
তিনি জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া আরও ১২টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে এবং সেগুলোতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের অপেক্ষা চলছে।
আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে সরকার সংবিধান সংস্কারে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনও পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘ক’ শ্রেণির আহতদের ৫ লাখ টাকা, ‘খ’ শ্রেণির আহতদের ৩ লাখ টাকা এবং ‘গ’ শ্রেণির আহতদের ১ লাখ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতাও চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। পাশাপাশি জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগামী ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থে যে যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আইন অনুযায়ী কার্যকর করা হবে।
সীমান্ত ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। সরকারের নীতি—‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গেজেটভুক্ত শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন এবং আহতসহ স্বীকৃত জুলাই যোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার ২১২ জন। এছাড়া শহীদদের ঘটনায় ৭৫১টি হত্যা মামলা, একটি অপমৃত্যু মামলা, ৩৩টি সিআর মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও নির্যাতিত প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম এবং অন্যতম বড় অর্জন ছিল ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’। এর ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণীত হয়েছে। তবে সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জাতীয় সনদে শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, যেখানে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘরে নির্যাতনসহ নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন হাজারো মানুষ।



