tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকজাতিসংঘে আব্বাসের ভার্চুয়াল ভাষণ, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান ঘিরে আইনি বিতর্ক

জাতিসংঘে আব্বাসের ভার্চুয়াল ভাষণ, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান ঘিরে আইনি বিতর্ক

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের কাজে অংশগ্রহণের জন্য আসা প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হলেও অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের মর্যাদা পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্রের নয়; দেশটি ‘পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃত। তবে এ অবস্থানের কারণে জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের।

এই বিতর্কের অন্যতম ভিত্তি ১৯৪৭ সালে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ-যুক্তরাষ্ট্র হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্ট। চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং সংস্থাটির আমন্ত্রণে সরকারি কাজে সদর দপ্তরে আসা ব্যক্তিদের যাতায়াতে বাধা না দেওয়ার বিধান রয়েছে।

১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রবেশাধিকারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হবে না। অন্যদিকে, ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিদেশিদের প্রবেশসংক্রান্ত মার্কিন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে না, যাতে চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় স্বীকৃত সুবিধা ব্যাহত হয়। যেসব প্রতিনিধির ভিসা প্রয়োজন, তাদের দ্রুত ও বিনা মূল্যে ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।

অবশ্য জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিনিধিদের প্রবে’শ ও ভিসার প্রক্রিয়া মার্কিন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে জাতিসংঘের কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা যায় কি না, আব্বাসের ঘটনাকে ঘিরে আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখন সেটিই।

ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে পুরোনো বিরোধ

জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রবেশ, ভিসা ও চলাচলের বিধিনিষেধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নতুন নয়। অতীতে রাশিয়া, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রশ্ন জাতিসংঘে আলোচনায় এসেছে।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘদিনের নজির। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) স্থায়ী পর্যবেক্ষক মিশনের কর্মকর্তারা হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্টের ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ধারার আওতায় পড়েন। অর্থাৎ জাতিসংঘের সরকারি কাজে নিউইয়র্কে আসার ক্ষেত্রে তাঁদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে—জাতিসংঘের অবস্থান ছিল এমনই।

ইরানের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত

এবারের অধিবেশনে ইরানের প্রতিনিধিদলকে ঘিরেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশনীতি আলোচনায় এসেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া না হলেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং তাঁদের মূল প্রতিনিধিদলকে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তাঁদের চলাচল নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার শর্ত ছিল।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, ইরানের প্রতিনিধিরা ভিসা পেলেও তাঁদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে দুটি ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ধরন এবং সেগুলোর পেছনে দেওয়া যুক্তি এক নয়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উভয় ঘটনাকে একইভাবে জাতিসংঘে প্রবেশে বাধা হিসেবে বিবেচনা করলে আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার ভিন্ন দিকগুলো উপেক্ষিত হতে পারে।

এ থেকে প্রশ্ন উঠছে, জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ কি কেবল কোনো দেশের সংস্থাটিতে থাকা মর্যাদার ওপর নির্ভর করে? নাকি সদর দপ্তর যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত, সেই রাষ্ট্রের ভিসা ও চলাচলসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের পরিধি নির্ধারণ করে দেয়?

ভার্চুয়াল বক্তব্য কি সরাসরি উপস্থিতির বিকল্প?

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ কেবল আনুষ্ঠানিক ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ সময় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সমঝোতার প্রচেষ্টা চলে। এসব কার্যক্রমের অনেকটাই প্রকাশ্য অধিবেশনের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়।

মাহমুদ আব্বাস ভিডিও সংযোগে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেও নিউইয়র্কে সশরীরে উপস্থিত থাকার সুবিধা পাননি। ফলে অন্য দেশের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ কতটা কার্যকর বিকল্প হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশনে অংশ নেওয়া এবং সেখানে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভিডিওতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ একটি সীমিত অধিকার নিশ্চিত করলেও সরাসরি উপস্থিতির মাধ্যমে পাওয়া সব ধরনের কূটনৈতিক সুযোগ তা প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বনাম আয়োজক দেশের ক্ষমতা

জাতিসংঘ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত। ফলে একদিকে রয়েছে আয়োজক দেশের সীমান্ত ও প্রবেশসংক্রান্ত আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, অন্যদিকে রয়েছে জাতিসংঘের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব।

কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের বাধা দিলে সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়—এ প্রশ্ন সামনে আসে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘ কোনো প্রতিনিধির অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে চাইলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যকর উপায় কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আব্বাসের ঘটনাটি এ বিতর্কের চূড়ান্ত সমাধান দেয়নি। বরং ১৯৪৭ সালের হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্টের বিধানকে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে মৌলিক প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে—আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কতটা কর্তৃত্ব জাতিসংঘের, আর কতটা সেই দেশের, যার ভূখণ্ডে সংস্থাটির সদর দপ্তর অবস্থিত