tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশগৌরীপুরে আগুনে পুড়ল শত বছরের নাট্যমঞ্চ ঝলমল সিনেমা হলসহ ২০ প্রতিষ্ঠান

গৌরীপুরে আগুনে পুড়ল শত বছরের নাট্যমঞ্চ ঝলমল সিনেমা হলসহ ২০ প্রতিষ্ঠান

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ ও ঝলমল সিনেমা হল। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঘটে যাওয়া এ অগ্নিকাণ্ডে সিনেমা হলের আশপাশের অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ভস্মীভূত হয়েছে।

আগুনে ডেকোরেশন সামগ্রীর দোকান, পুরোনো কাপড়ের দোকান, এলপিজি সিলিন্ডারের গুদামসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডে সব মিলিয়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গভীর রাতে ঝলমল সিনেমা হলের দিক থেকে আগুনের শিখা দেখতে পান তারা। এ সময় কয়েক দফা বিকট শব্দও শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চের কাঠের কাঠামো এবং আশপাশের দোকানপাটে।

খবর পেয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, প্রাথমিকভাবে একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুড়ে গেছে কোটি টাকার সম্পদ

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে টিএ টিম্বার তাজ ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী তাহাজ উদ্দিন ভুট্টো জানান, আগুনে তাঁর ১১টি মেশিন পুড়ে গেছে। এসব মেশিনের আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রায় ৬০ লাখ টাকার কাঠও পুড়ে গেছে।

গ্যাসের ডিলার জামাল উদ্দিন বলেন, রাতে গ্যাসের প্রায় ২৫০টি বোতল নামিয়ে তিনি বাড়িতে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট পর আগুন লাগার খবর পান। পরে ঘটনাস্থলে এসে দেখেন, আগুনে সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডে তাদের সম্মিলিতভাবে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

যে ইতিহাস হারাল গৌরীপুর

স্থানীয়দের কাছে এই অগ্নিকাণ্ড কেবল কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গৌরীপুরের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। আগুনে ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চের কাঠের কাঠামো পুড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

সূত্র মতে, বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে গৌরীপুর রাজপরিবারের বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর উদ্যোগে ঐতিহাসিক এই নাট্যমঞ্চ নির্মিত হয়। কলকাতায় অবস্থানকালে ঐতিহ্যবাহী ‘স্টার থিয়েটার’-এর স্থাপত্যশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তিনি গৌরীপুরে কাঠের নান্দনিক কাঠামোয় এই নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শুরুতে নাট্যমঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত এই স্থানে ‘শাহজাহান’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এর সাংস্কৃতিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশের শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় স্থানটি গৌরীপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তদন্তের দাবি

অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং এর আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার পেছনে প্রকৃত কারণ কী।

তারা ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগেরও দাবি উঠেছে।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থাপনাটি লিজে ছিল। প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না থাকায় লিজগ্রহীতাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে লিজসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।