বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ৩৪ বছর পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই ভোটাভুটি—জুলাই জাতীয় সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে। তবে গণভোটের সময়সূচি নিয়ে মতভেদে পড়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট চায়, আর জামায়াত চায় চলতি নভেম্বরেই আলাদা করে তা সম্পন্ন করতে।
গণভোটের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘গণভোট নিয়ে সরকার থেকে কোনো নির্দেশনা বা আলোচনা পাইনি। ফলে ইসি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতেই রয়েছে।’
ইসি সূত্র জানায়, গণভোট হবে কিনা, এবং হলে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একদিনে নাকি আলাদা করে হবে—সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। সরকারের নির্দেশনা পেলে ইসি প্রস্তুতি শুরু করবে। গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ, ভোটকক্ষ ও লজিস্টিকসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা লাগবে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ ও অন্যান্য দপ্তরকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘গণভোট নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। আমাদের কাজ হলো এটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে নাকি পৃথক দিনে হবে, তা সরকারই নির্ধারণ করবে।’
ইসি মনে করছে, একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন হলে ভোটকেন্দ্র ও কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়বে। আলাদা দিনে হলে খরচও দ্বিগুণ হবে।
সম্ভাব্য প্রশ্ন ও আইনগত বিষয়
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোটে চার থেকে পাঁচটি প্রশ্ন থাকতে পারে। এর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মতো বিতর্কিত প্রস্তাবও থাকতে পারে।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট নেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। এতে খরচ ও সময় দুটোই বাঁচবে।’ তাঁর মতে, গণভোট করতে সংবিধান সংশোধনের দরকার নেই; বিদ্যমান আইন সংশোধন করলেই সম্ভব।
বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাস
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনবার গণভোট হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে।
- ১৯৭৭: জিয়াউর রহমানের নীতি ও কর্মকৌশলে আস্থা যাচাই—৯৮.৮৭% ‘হ্যাঁ’।
- ১৯৮৫: এরশাদের নীতিতে আস্থা ও তার বৈধতা যাচাই—৯৪.৫% ‘হ্যাঁ’।
- ১৯৯১: সংসদীয় সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে—৮৪% ‘হ্যাঁ’।
প্রশাসনিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ
সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ, যিনি ১৯৯১ সালের গণভোট আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বলেন, ‘গণভোটে ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকে। তবে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে হলে অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।’
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম মনে করেন, গণভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার ও নাগরিক শিক্ষা জরুরি। ‘১৯৯১ সালের পর মানুষ গণভোট কী, তা প্রায় ভুলেই গেছে। এবার হলে গণভোট সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে,’ বলেন তিনি।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণভোটের বিধান ছিল না। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এটি যুক্ত করেন। তবে ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর পর এই বিধান আংশিকভাবে বাতিল হয়। বর্তমানে প্রস্তাবনা ও সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান আইন সংশোধন করলেই সরকার নতুন করে গণভোট আয়োজন করতে পারে। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়েও এ বিষয়ে কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই।
উপসংহার
গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত এখন সরকারের হাতে। বিএনপি–জামায়াতের অবস্থান ভিন্ন হলেও, নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে সরকারের নির্দেশ পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সুষ্ঠু প্রস্তুতি নিশ্চিত হলে, ৩৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশের ভোটাররা গণভোটের ব্যালটে তাদের মতামত জানাতে পারেন।



