tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশক্ষমতার অপব্যবহার যেন নতুন অপরাধের জন্ম না দেয়

ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নতুন অপরাধের জন্ম না দেয়

আবু হেনা রাজ্জাকী
আইনজীবী ও রাজনীতি বিশ্লেষক

সমাজে অপরাধের বিস্তার কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায়ের প্রশ্রয় এবং আইনের প্রয়োগে বৈষম্য। বিশেষ করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনসম্পত্তি দখল, অবৈধ অর্থ উপার্জন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে এবং তার যথাযথ প্রতিকার না হলে তা সমাজের অন্যদেরও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্যায় যেন একসময় অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত না হয়।

সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত আশুলিয়ার কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের জমিসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন এ বিষয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির ১৬৪ শতক জমি একটি প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল এলাকার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের ওই জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচাবাজারের আড়ত।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই আড়ত থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়। জমিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি কেবল জমির অপব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জনকল্যাণের জন্য নির্ধারিত সম্পদ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের একটি গুরুতর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।

একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পেতেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হতো। সেই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পরিবর্তে জমিটি অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তাই নিছক আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এটি জনস্বার্থ ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন।

একটি অন্যায় যেন আরও দশটি অন্যায়ের জন্ম না দেয়

এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজে কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনো ব্যক্তি জনসম্পত্তি দখল কিংবা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যরাও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত হতে পারেন। বিশেষ করে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার না হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এর প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ বাজার দখল, কেউ ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, কেউ পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, আবার কেউ সরকারি জমি দখলের মাধ্যমে অবৈধ আয়ের পথ খুঁজতে পারেন। ফলে একটি অন্যায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না থেকে আরও অনেক অনিয়মের অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—একজনের ক্ষমতার অপব্যবহার যেন অন্য দশজনের কাছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের দৃষ্টান্ত হয়ে না দাঁড়ায়।

তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা

ক্ষমতার অপব্যবহার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির প্রভাব তরুণ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে। একজন তরুণ যখন দেখে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ কেউ সহজেই বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার হচ্ছে না, তখন তার মধ্যে পরিশ্রম ও বৈধ উপায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিবর্তে অন্যায় পথে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সমাজে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক বৈষম্যসহ নানা কারণ রয়েছে। তাই এসব অপরাধের জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়। তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনিয়মের প্রতিকার না হলে তা অপরাধের প্রতি পরোক্ষ সহনশীলতা তৈরি করতে পারে। আইন অমান্য করেও পার পাওয়া যায়—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা প্রায়ই প্রশ্ন তুলি, সমাজে ছিনতাই কেন বাড়ছে, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস কেন বন্ধ হচ্ছে না। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের ওপরের স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

একজন সাধারণ ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিপুল মূল্যমানের সম্পত্তি দখল কিংবা অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলেও তা সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের গুরুত্ব নির্ধারণ করতে হবে অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে—অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়।

দৃষ্টান্ত স্থাপনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব

এখানে ইংরেজি প্রবাদ ‘Charity begins at home’—অর্থাৎ ভালো কাজের সূচনা নিজের ঘর থেকেই—বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সমাজ থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও অন্যান্য অপরাধ দূর করতে চায়, তাহলে নিজেদের সংগঠনের ভেতরে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হবে।

নিজ দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা রাজনৈতিক বিবেচনায় আড়াল করা কিংবা তদন্তের বাইরে রাখার চেষ্টা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় হতে পারে না। বরং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অঙ্গীকার। এতে দলের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি জনগণের আস্থাও সুদৃঢ় হয়।

রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের দেওয়া একটি দায়িত্ব, ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের অবাধ সুযোগ নয়। এই উপলব্ধি নেতৃত্বের আচরণে প্রতিফলিত হলে সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।

কামারপাড়ার জমি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি

আশুলিয়ার কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের জমির ক্ষেত্রে প্রথমেই যাচাই করা প্রয়োজন, কী শর্তে জমিটি হস্তান্তর করা হয়েছিল, এর বর্তমান ব্যবহার কতটা বৈধ এবং জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থের হিসাব কী। জমির মালিকানা, হস্তান্তরসংক্রান্ত দলিল, চুক্তির শর্ত, দখলের বৈধতা ও ভাড়া আদায়ের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করতে হবে।

তদন্তে অনিয়ম বা অবৈধ দখলের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে যে জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে জমিটি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ জনস্বার্থে নির্ধারিত সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ।

এ ক্ষেত্রে তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিতে না পারে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হোক অগ্রাধিকার

তরুণ প্রজন্ম শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিকতা শেখে না; তারা সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের আচরণ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তাদের মধ্যে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। বিপরীতে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিকার না হলে আইন অমান্য করেও পার পাওয়া সম্ভব—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অতএব, সমাজ থেকে অপরাধ দূর করতে হলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধকে উৎসাহিত করে এমন পরিবেশ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতিরও অবসান ঘটাতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের সমান প্রয়োগ এবং জনসম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতা কখনো ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হতে পারে না। এর মূল উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডে এই নীতি প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যায়ের প্রতিকার না হলে তা আরও অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে; আর আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের বিস্তার রোধের পাশাপাশি সমাজে নৈতিকতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিও শক্তিশালী হবে।

আবু হেনা রাজ্জাকী
আইনজীবী ও রাজনীতি বিশ্লেষক