পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। এটি ইরানের জন্য শুধু একটি নৌপথ নয়; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দু এবং একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার—যার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলা সম্ভব।
ইরান কেবল প্রণালিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আগ্রহী নয়; বরং প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি, কূটনৈতিক সুবিধা আদায় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যও অনুসরণ করে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে প্রভাব বিস্তার মানে শুধু নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ নয়—বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার।
ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল। এই সংকীর্ণ পথের মধ্যে নির্দিষ্ট নৌ চলাচল করিডর রয়েছে, যা ইরান ও ওমানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় পড়ে। ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং কৌশলগত দ্বীপসমূহ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ অংশে তাকে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী অবস্থানে রাখে।
এই প্রণালির কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। সুয়েজ বা পানামা খালের মতো এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি একটি বাধ্যতামূলক পথ।
আইনগত দিক থেকেও হরমুজ প্রণালির অবস্থান জটিল। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন প্রযোজ্য হলেও, এর ব্যাখ্যায় ইরানের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। ইরান মনে করে, তার নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করে এমন কোনো চলাচল বৈধ নয়—ফলে প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ রাখে।
অর্থনৈতিকভাবে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রবাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া জ্বালানি ছাড়াও সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব রয়েছে। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষত আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
ইরানের কৌশল পুরোপুরি প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা—যেখানে প্রয়োজনে চাপ সৃষ্টি করা, আবার প্রয়োজনে পথ উন্মুক্ত রাখা—এই নমনীয়তা বজায় থাকে।
ইতিহাসে যেমন সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে, তেমনি হরমুজ প্রণালিও আধুনিক ভূরাজনীতিতে একই ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
সব মিলিয়ে, ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেওয়া যে কোনো শক্তির জন্য অত্যন্ত কঠিন।
সূত্র : প্রেস টিভি



