tanaka
প্রচ্ছদরাজনীতিপতিত ও নব্য স্বৈরাচারকে পরাজিত করা হবে: নাহিদ ইসলাম

পতিত ও নব্য স্বৈরাচারকে পরাজিত করা হবে: নাহিদ ইসলাম

পতিত স্বৈরাচারের পাশাপাশি দেশে নতুন করে যে স্বৈরাচারের উত্থান ঘটছে, তাকেও পরাজিত করার অঙ্গীকার করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের সামনে আমাদের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি—পতিত স্বৈরাচার এবং নব্য স্বৈরাচার, এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশাআল্লাহ।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শুক্রবার বিকেলে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিএনপি সরকার ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। তাদের পরিকল্পনা দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস কায়েমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর পর দেশে আবার নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখা যাচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নানা ষড়যন্ত্র চলছে। সীমান্তে হত্যা, পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন এবং দিল্লিতে মসজিদ ভাঙার মতো ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের নিয়েও ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরেও প্রতিবেশী দেশ থেকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ভারতের এসব তৎপরতা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার সক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই।

ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য করিডর ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, জাপান সফরে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে করিডর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ভারতের হাতে অবৈধ করিডর তুলে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চলছে, তা দেশের মানুষ মেনে নেবে না। তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কোনো অবৈধ করিডর মেনে নেবে না।

গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আগামী ডিসেম্বরে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে চুক্তি নবায়ন করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষ আবারও রাজপথে নামবে। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এবার একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে চলমান নৈরাজ্য, খুন ও গুমের দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। অন্যথায় আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে মিছিল নিয়ে তারেক রহমানকে ঘেরাও করে দাবি আদায় করা হবে।

সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের আগে বারবার বলেছিল, নির্বাচন হলে দেশের সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু নির্বাচনের নয় মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বরং দল হিসেবে বিএনপিও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

তিনি দাবি করেন, গত নয় মাসে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলদারিত্ব ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। এসব অপরাধের বিচার ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সংবিধান রক্ষায় ব্যস্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আখতার হোসেন বলেন, ‘আপনারা যে ব্যর্থ বাংলাদেশ তৈরি করেছেন, এর দায় সরাসরি তারেক রহমানকেই নিতে হবে।’

দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাধারণত বাজেট ঘোষণার সময় নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও বিএনপি সরকার দাবি করেছে, বাজেটের সময় কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। অথচ বাজেটের আগে, পরে এবং এখনো প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

গ্যাসের দামের তুলনা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এক হাজার টাকায় গ্যাস পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে একই গ্যাস কিনতে গ্রাহকদের প্রায় আড়াই হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। কলকাতায় যদি ইরান যুদ্ধের প্রভাব না পড়ে, তাহলে বাংলাদেশে কেন এত বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে—জ্বালানিমন্ত্রীকে এর জবাব দিতে হবে।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে মানবাধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়নের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সরকার শক্তিশালী আইনের পরিবর্তে দুর্বল আইন তৈরি করেছে। এতে ইচ্ছেমতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার পর তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার ব্যর্থ হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমন উল্লাস প্রকাশের সাহস পাচ্ছেন।

এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।

সমাবেশ থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরেন আখতার হোসেন। দাবিগুলো হলো—

১. একদলীয় ও একতরফা সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।

২. মানবাধিকারের পরিপন্থি সব আইন বাতিল করতে হবে এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে কোনো ধরনের সংশোধনী আনা যাবে না।

৩. ২০২৪ সালের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

৪. গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করে চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

আখতার হোসেন বলেন, আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারে, তা জনগণের কাছে প্রমাণ করতে হবে।