ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন–পীড়নের লোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ করেছে বিবিসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্ষোভকারী জানান, তিনি ও তার এক বন্ধু মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে একটি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এসে জনতার উদ্দেশে চিৎকার শুরু করে।
তিনি বলেন, তার বন্ধু নিরাপত্তা বাহিনীর এক সশস্ত্র সদস্যকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা গুলি না চালায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ওই সদস্য তাদের লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাদের পোশাক রক্তে ভিজে যায়।
আহত অবস্থায় এক অপরিচিত ব্যক্তি তাদের গাড়িতে তুলে নেন। তবে গ্রেফতারের আশঙ্কায় তারা হাসপাতালে যেতে রাজি হননি। চারদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে তারা একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। ভোর না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানেই অবস্থান করেন। পরে পরিচিত এক চিকিৎসক তাদের পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।
একজন সার্জন বাড়িতেই কিছু গুলি অপসারণ করতে সক্ষম হন। তবে তিনি সতর্ক করে জানান, সব গুলি বের করা সম্ভব নয় এবং কিছু গুলি শরীরেই থেকে যাবে।
চলতি মাসে ইরানজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন–পীড়নে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও জানা যায়নি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টিং সীমিত হওয়ায় প্রকৃত চিত্র আড়ালেই রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ শিশু, ৫০ পথচারী এবং ২১৪ জন সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। সংস্থাটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করছে।
এ ছাড়া অন্তত ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকেই গ্রেফতারের ভয়ে হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আহতদের চিকিৎসায় ঝুঁকি নিচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবীরা। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত উপস্থিত থাকছে এবং আহতদের শনাক্ত করতে মেডিকেল রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তেহরানের এক সার্জন নিমা জানান, ৮ জানুয়ারি তিনি কাজের পথে বহু তরুণকে রাস্তায় আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। একজনকে তিনি নিজের গাড়ির বুটে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রায় ৯৬ ঘণ্টা টানা অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। হাসপাতালের পোশাকসহ তাদের ব্যক্তিগত কাপড় রক্তে ভিজে ছিল।
নিমা আরও জানান, অনেক তরুণের গুলি লেগেছে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে, যার ফলে অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হয়েছে এবং অনেকে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, চলমান পরিস্থিতিতে তিন হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা দাঙ্গাবাজদের হামলায় নিহত পথচারী।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এ সময় ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, হাসপাতালগুলো নিরপেক্ষভাবে সব আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিচ্ছে।
তবে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে আহত বিক্ষোভকারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকরাও এখন নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
নরওয়েভভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচ চিকিৎসক ও এক স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, চিকিৎসকদের গ্রেফতার ও অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালিয়ে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা করার অভিযোগে এক সার্জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’র মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি



