ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে একটি নতুন নির্বাহী আদেশে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার জারি করা এই আদেশের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করার পদক্ষেপ নিলেন তিনি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নির্বাহী আদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো শুল্কহার নির্ধারণ করা না হলেও উদাহরণ হিসেবে ২৫ শতাংশ হারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, যে দেশগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইরান থেকে পণ্য বা সেবা ক্রয়, আমদানি কিংবা অন্য কোনো উপায়ে সংগ্রহ করবে, সেই দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। যদিও শুক্রবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এ আদেশ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি, তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
ওমানের রাজধানী মাস্কাটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শেষ হওয়ার পরপরই ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি এই নির্বাহী আদেশ জারি করেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বাগযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হুমকির পর ওমানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা শুরু হয়। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ। আলোচনায় ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ট্রাম্প আলোচনাকে ‘খুবই ভালো’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে তিনি সতর্ক করে জানান, চুক্তি না হলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত কঠোর। আগামী সপ্তাহের শুরুতে আবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। গত ১২ জানুয়ারি তিনি লিখেছিলেন, যে কোনো দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের এই শুল্ক দিতে হবে। তবে সেই পোস্টে সিদ্ধান্তটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না। শুক্রবারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই ঘোষণাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল।
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নির্বাহী আদেশ ইরানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’র অংশ। বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা, সন্ত্রাসবাদে সমর্থন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করেন। এসব কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও তার মিত্রদের জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে প্রয়োজনে এই আদেশে সংশোধন আনার সুযোগ রাখছেন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে শুক্রবারই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। বর্তমানে এসব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশ্বের শতাধিক দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরান থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করেছে। চীনের পরেই রয়েছে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ক। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের রপ্তানি বাণিজ্য সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।



