tanaka
প্রচ্ছদসর্বশেষ সংবাদঅর্থনীতিইউরোপজুড়ে অস্থিরতা, নতুন অর্ডার নিয়ে উদ্বেগে বাংলাদেশের পোশাক খাত

ইউরোপজুড়ে অস্থিরতা, নতুন অর্ডার নিয়ে উদ্বেগে বাংলাদেশের পোশাক খাত

ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ ও সামাজিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর প্রভাবে পোশাকের চাহিদা হ্রাস, নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ফলে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ভোক্তা ব্যয়ে সংকোচন দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন পোশাকের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে আরও কম দামে পণ্য সরবরাহের জন্য চাপ দিচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন মৌসুমের ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন অনেক ব্র্যান্ড।

এমনিতেই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। এর মধ্যে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে চলমান বিক্ষোভের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফরাসি ক্রেতার ক্রয়াদেশ স্থগিত

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এবং নারায়ণগঞ্জের নিট পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামীম এহসান বলেন, ফ্রান্সের একজন বড় ক্রেতা কয়েক দিন আগে তাঁদের একটি ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছেন। অথচ এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ওই ফরাসি ক্রেতার আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের কারণে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে গেলে ক্রেতারা নতুন করে ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবেন। একই সঙ্গে পণ্যের দাম কমানোর চাপও বাড়তে পারে। এতে রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বার বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ইতিমধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। সেখানে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আট মাসে ইইউতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো বা ১১.৬৭ শতাংশ।

একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মোট পোশাক আমদানিও কমেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর দেশগুলো ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২৬৯ কোটি ইউরো। সে হিসাবে আমদানি কমেছে প্রায় ৩.৮৩ শতাংশ।

এ সময়ে পোশাকের গড় আমদানি মূল্যও হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ছিল ১৯.৯১ ইউরো। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৬৫ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য কমেছে ১.২৯ শতাংশ।

পরিসংখ্যানগুলো ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা ও মূল্য নিয়ে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে পণ্যের দাম কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে রাজি নন। বরং তাঁরা আরও কম দামে পোশাক সরবরাহের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এতে রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

তিন মাসের হিসাবে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি

তবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির চিত্র সব সময় একই রকম নয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৯০ কোটি মার্কিন ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ রপ্তানি বেড়েছে ৩.৩৩ শতাংশ।

তবে এ সময়ে ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে রপ্তানি কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ইপিবির হিসাবে প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য পতন—এ দুই পরিসংখ্যানের সময়সীমা ও হিসাবের ভিত্তি আলাদা। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে উভয় তথ্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, আবাসন ব্যয় বহনের সক্ষমতা, শিক্ষা ও সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তোষের কারণে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব বিক্ষোভ ও অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ভোক্তা আস্থা ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আর এর প্রভাব পড়লে ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের পোশাকশিল্পও চাপে পড়বে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা, পণ্যের মূল্য নিয়ে দর-কষাকষি এবং উৎপাদন ব্যয়—সবকিছুই একসঙ্গে ব্যবসার হিসাবকে প্রভাবিত করছে। গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যয়, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকদের মজুরিসহ পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

চাহিদা কমে গেলে ক্রেতারা আরও কম দামে পোশাক কেনার চেষ্টা করতে পারেন। এতে একদিকে রপ্তানিকারকদের মুনাফার পরিমাণ কমবে, অন্যদিকে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিকল্প বাজার ও কৌশলগত প্রস্তুতির তাগিদ

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে একই সঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। প্রথমত, নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি। দ্বিতীয়ত, কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ বৃদ্ধি।

এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক চাহিদা ও ক্রয়াদেশের প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে রপ্তানিকারকদের আগাম পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ বাজার। ফলে এ অঞ্চলে আমদানি ও ভোক্তা চাহিদা কমে গেলে তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতেও পড়তে পারে। ইউরোপের অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব, ক্রেতাদের ক্রয়নীতি এবং বাজারে চাহিদার গতিপ্রকৃতির ওপর।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—ইউরোপের বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যচাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য আগাম প্রস্তুতি, বাজার বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।