মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় এখন ১০০ টাকায় ৩ কেজি আম বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেসব আমের কেজি ৭০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে ছিল, সেগুলোর দাম এখন নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৫০ টাকায়। এতে সাধারণ ক্রেতারা স্বস্তি পেলেও লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাম্পার ফলন, একসঙ্গে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসা, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ এবং রপ্তানি বাজারের সীমাবদ্ধতা—এই চারটি কারণেই আমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
চট্টগ্রামের কদমতলী ফলমন্ডি, রেয়াজউদ্দিন বাজার ও স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি আম আসছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ক্রেট আম থাকে এবং প্রতি ক্রেটে গড়ে ২২ থেকে ২৫ কেজি আম থাকে। প্রতিদিন ৫ থেকে ৭টি ট্রাক আম চট্টগ্রামে প্রবেশ করছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, নওগাঁ ও দিনাজপুর থেকেও বিপুল পরিমাণ আম সরবরাহ হচ্ছে।
বাজারে বর্তমানে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন ও গোপালভোগসহ প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, একই জাতের আমও মানভেদে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাম্পার ফলনের প্রভাব
দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ এ বছরের বাম্পার ফলন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আম উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার আমের দাম অনেক কম। খাগড়াছড়ির বাগান ব্যবসায়ী মো. ফোরকান বলেন, এবার ২২ কেজির এক ক্রেট আম মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম।
একসঙ্গে বাজারে এসেছে সব জাতের আম
সাধারণত বিভিন্ন জাতের আম ধাপে ধাপে বাজারে এলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া ও বারি-৪সহ বিভিন্ন জাতের আম একসঙ্গে বাজারে এসেছে। গাছে পাকা আম দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব না হওয়ায় দ্রুত সংগ্রহ ও বিক্রি করতে হয়েছে, ফলে বাজারে সরবরাহের চাপ বেড়ে গেছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আমের সরবরাহ যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে ক্রেতা বাড়েনি। ফলে দ্রুত বিক্রির জন্য অনেক বিক্রেতাকে দাম কমাতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, মৌসুমের শুরুতেই প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম বাজারে চলে আসায় দাম কমেছে। তবে জুলাই মাসে নতুন জাতের আম বাজারে এলে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
রপ্তানি বাজারে সীমাবদ্ধতা
দেশে আম উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়, প্যাকেজিং খরচ এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে বিপুল পরিমাণ আম দেশীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, বাগান থেকে আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেজিং করতে কেজিপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আম তুলনামূলক বেশি দামে পড়ে।
বিশ্বে আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম হলেও রপ্তানিতে দেশটির অবস্থান এখনও অনেক পিছিয়ে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, দেশের আমের বাজারের আকার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি সহজ ও সম্প্রসারিত করা গেলে এ বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রেতাদের স্বস্তি
অন্যদিকে, দাম কমে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, কয়েক বছর পর এবার তুলনামূলক কম দামে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মন ভরে আম খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের সৈয়দ শাহ রোড এলাকায় ভ্যানে আম বিক্রি করা তসলিম মিয়া বলেন, এলাকার অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী। দাম কম থাকায় তারা বেশি পরিমাণে আম কিনছেন। গত দুই দিনেই ওই এলাকায় প্রায় ৭৫টি ভ্যান আম বিক্রি করতে এসেছে।



