tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়‘আমরা ওই জায়গায় নেই, নো পাওয়ার, নো মানি’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘আমরা ওই জায়গায় নেই, নো পাওয়ার, নো মানি’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কেন্দ্রের মালিকদের অর্থ দেওয়ার বিতর্কিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নতুন করে অনুমোদন পাওয়া তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হবে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ ভিত্তিতে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে অর্থ দেওয়া হবে, উৎপাদন না হলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধী দলের উত্থাপিত প্রস্তাবের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গ্যাসের ওপরও সরকার পুরোপুরি নির্ভর করতে চায় না। বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বড়পুকুরিয়ায় তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে একটি বর্তমানে অকার্যকর, অন্য একটির উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে এবং আরেকটিতে নতুন করে স্থাপনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সেখানে দেশীয় কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা কেন্দ্রটির সংস্কার করে সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ধাপের একটি চুক্তি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের ওই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শিগগিরই শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

গ্রিডলাইন নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে গ্রিডলাইন নির্মাণ করতে না পারলে প্রয়োজনে সরকার অর্থায়ন করে তা নির্মাণ করবে—এমন নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

‘উত্তরাধিকার সূত্রে সংকট পেয়েছি’

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা সংকট উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ’ রেখে যাওয়া আর্থিক সংকট, ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা ছয় মাসের মধ্যে পুরোপুরি সংস্কার করে ফেলা সম্ভব হবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়।

সরকার পরিকল্পনা নিয়ে ধাপে ধাপে সংকট মোকাবিলা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভোগান্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে এই সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়; এর পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি গত ১৭ বছরে তৈরি হওয়া নানা সমস্যা রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতে জ্বালানির উৎস নিশ্চিত না করেই অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কোথা থেকে গ্যাস আসবে, তার নিশ্চয়তা ছিল না; এমনকি প্রয়োজনীয় পাইপলাইনও নির্মাণ করা হয়নি।

‘নো ক্যাপাসিটি চার্জ, নো পাওয়ার, নো মানি’

ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময় এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার সেটির উত্তরাধিকার পেয়েছে। তবে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে অনুমোদন দেওয়া নতুন তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ থাকবে না।

তিনি বলেন, ‘নো ক্যাপাসিটি চার্জ; নো পাওয়ার, নো মানি—এটাই হচ্ছে আমাদের দেশপ্রেম। আমরা ওই জায়গায় নেই।’

বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কয়েকটি চুক্তি নিয়েও সংসদে কথা বলেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো দেশের সঙ্গে করা চুক্তি রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব নয়। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে কিছু বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সরকার মনে করে। তবে এখনই এসব চুক্তি বাতিল করা হলে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, দেশে এমনিতেই বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় চুক্তি বাতিল করলে আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

মেয়াদ শেষ হওয়া পাঁচ কেন্দ্র থেকে মিলবে ৫০০ মেগাওয়াট

পরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। কারণ এসব চুক্তি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছে। বিষয়গুলো সরকার যাচাই-বাছাই করছে।

তবে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পাঁচটির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এসব কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। চলতি সপ্তাহ থেকেই ওই পাঁচটি কেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

মন্ত্রীদের আরও স্পষ্ট হওয়ার আহ্বান

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জনগণের সামনে আরও স্পষ্টভাবে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

তিনি বলেন, বিভিন্ন জনসভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কথা উঠলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি স্বীকার করে জনগণের কাছে বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সংকটের কারণ ও সরকারের করণীয় বিষয়ে একই ধরনের স্পষ্ট বক্তব্য সবসময় পাওয়া যায় না।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, জনগণের সামনে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলে বিভ্রান্তি কমবে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সংকট স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদেরও একইভাবে বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।