ভারতের অযোধ্যার রাম মন্দিরের দানবাক্স থেকে কোটি কোটি রুপি আত্মসাতের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি)-এর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মী পরিকল্পিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করে দানবাক্সের টাকা চুরি করতেন। চুরি করা অর্থ প্রথমে মন্দিরের টয়লেটে লুকিয়ে রাখা হতো, পরে সুযোগ বুঝে বাইরে পাচার করা হতো।
তদন্তের অগ্রগতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) নৈতিক দায় স্বীকার করে রাম মন্দির ট্রাস্টের দুই কর্মকর্তা চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। এদিকে গ্রেফতার আট অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দানবাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ার আগে হিসাব পর্যালোচনায় অনিয়ম ধরা পড়ে। সাধারণত একটি দানবাক্সে ৬ থেকে ৭ লাখ রুপি থাকার কথা থাকলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ৫০০ রুপির নোটের বান্ডিলে ঘাটতি দেখা যায়।
এরপর সন্দেহের ভিত্তিতে অর্থ গণনার কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, একজন কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে সিসিটিভির সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্য আড়াল করছেন। সেই সুযোগে আরেকজন নোটের বান্ডিল থেকে টাকা বের করে নিজের পোশাকের ভেতরে লুকিয়ে ফেলছেন।
এসআইটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নোটের বান্ডিলে অতিরিক্ত নোট ঢুকিয়ে রাখতেন। পরে শুধু বান্ডিলের সংখ্যা গুনে ভাউচার তৈরি করা হতো। ব্যাংকে অর্থ পাঠানোর আগে অতিরিক্ত নোট সরিয়ে নেওয়ায় কাগজে-কলমে হিসাব ঠিক থাকলেও বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হতো।
তদন্তে জানা গেছে, চুরি করা অর্থ প্রথমে মন্দির চত্বরে থাকা টয়লেটে লুকিয়ে রাখা হতো। পরে তা বাইরে নিয়ে গিয়ে ভাগ করে নেওয়া হতো।
সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালে মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই এই চক্র সক্রিয় ছিল। চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজে অন্তত ৭০টি চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
তদন্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার নামও উঠে এসেছে। পাশাপাশি আরও কয়েকজন সরকারি কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি রুপি আত্মসাতের দাবি করা হয়েছে, সরকারি হিসাবে এখনো ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানানো হয়নি। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো গণনার কাজ চলছে। তদন্তকারীদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এসআইটির প্রতিবেদনে আট অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন— অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লাভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পান্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদব।
তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের অনেকেই সুপারিশের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তিন্নু যাদব তার চাচাতো ভাই মনীশ যাদবকে অর্থ গণনার দলে নিয়োগ করান। একইভাবে অনুকল্প মিশ্র তার ভগ্নিপতি লাভকুশ মিশ্রকেও একই দলে অন্তর্ভুক্ত করেন।
এসআইটির ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব শেষে কর্মীদের শরীর তল্লাশি না করায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। এই সুযোগে তারা নিয়মিত দানবাক্স থেকে নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাৎ করতেন।
তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অবিনাশ শুক্লা চুরি করা অর্থ নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতেন। শুধু নগদ অর্থ নয়, ভক্তদের দান করা স্বর্ণালংকারও আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল কানের দুল, নাকফুল, চুড়ি, রামলালার জন্য উৎসর্গ করা গয়না এবং নূপুর।
এসআইটির প্রতিবেদনে তিন্নু যাদব ও সুভাষ শ্রীবাস্তবকে পুরো চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এই দুজনের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া গত তিন বছরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দানবাক্সের হিসাব ও সংখ্যার মধ্যে অসঙ্গতি, অপর্যাপ্ত সিসিটিভি নজরদারি, অর্থ গণনার রেকর্ড সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং তদারকির ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাবের বিষয়ও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা আগেই শনাক্ত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নিরাপত্তা প্রোটোকল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং নিয়ম মানা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতায়।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে ওই স্থানে রাম মন্দির নির্মিত হয়। মন্দির উদ্বোধনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বহুল আলোচিত অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে এলো।



