tanaka
প্রচ্ছদঅন্যান্যপ্রতিশোধ নাকি সংস্কার, পাকিস্তান নাকি ভারত—তারেক রহমানের সামনে কঠিন পরীক্ষা

প্রতিশোধ নাকি সংস্কার, পাকিস্তান নাকি ভারত—তারেক রহমানের সামনে কঠিন পরীক্ষা

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের মতামত

বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অতীতের অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করা, নাকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অতীতের ক্ষত পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন চক্র তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। অন্যদিকে, স্থিতিশীলতার অজুহাতে অতীতের অপরাধ উপেক্ষা করলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই বড় পরীক্ষা।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের সামনে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেশটি কি ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে বেরিয়ে এমন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে?

অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বহু মানুষ শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাগুলো ভুলতে প্রস্তুত নন। এসব ঘটনায় তৎকালীন সরকারের অনুগত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। ফলে অতীতের অপরাধের বিচার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর সংস্কারের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তিনি ও তাঁর সরকার রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব কতটা কমাতে পারবেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে গড়ে ওঠা স্বার্থের বলয় ও প্রভাব মোকাবিলা করাও সহজ হবে না। রাজনৈতিক বিভাজন, অবিশ্বাস ও মেরূকরণের কারণে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

গত ২৮ অক্টোবর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি এই সরকারকে দায়মুক্তি দিয়ে দিই, তাহলে আবারও ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি হতে পারি। আবারও ১ হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে কোনো ফ্যাসিবাদী সরকারকে উৎখাত করতে চাই না।’

তিনি ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে দাবি করেন, বিচার বিভাগ এখনো ক্ষমতাসীনদের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি এবং দেশে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া কিছু ক্যাডার ব্যক্তিগত বিরোধ মেটাতে নিজেদের দলের নেতাকর্মীদেরও হত্যা করছে।

একই দিন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণির পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বাংলাদেশকে ‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ বলেও আখ্যা দেন এনসিপি নেতা। তাঁর ভাষ্য, ‘সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও অস্ত্র বহন করছেন। এটাই মাফিয়া রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।’

এ ছাড়া মাদক ব্যবসার গডফাদার, মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য এবং এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার অভিযোগও তোলেন তিনি।

তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা একটি রাজনৈতিক দলের নেতার এসব বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। তবে বক্তব্যগুলোর মধ্যে যে মৌলিক উদ্বেগ উঠে এসেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত সংস্কার কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের মূল সুর হলো, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সহিংসতা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই সক্রিয় থাকলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাও পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরবিষয়ক বার্ষিক সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশন ও সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিক এবং তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাতেও এ ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। সম্মেলনে ভূরাজনীতি, আন্তরাষ্ট্রীয় সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের ভারসাম্য

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের একটি অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করার পক্ষে। তবে শেখ হাসিনা সরকারের আমলের পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভারতঘনিষ্ঠ অবস্থান এই পরিবর্তনের পথে এখনো প্রভাব বিস্তার করছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ইতিমধ্যে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা আঞ্চলিক সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলছে। ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগও নিচ্ছে।

তবে বৈদেশিক বাণিজ্য, পানিসম্পদ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বহির্নির্ভরতা পররাষ্ট্রনীতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও সহায়তানীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর ভারত যে কূটনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে, তার কিছুটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ধারাবাহিক সফর ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ভারতঘনিষ্ঠ মানসিকতা ও সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তন করা সহজ হবে না। বর্তমান সরকারও এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সে কারণেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢাকা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্থলসীমান্তের অধিকাংশ ভারতের সঙ্গে এবং অভিন্ন প্রধান নদীগুলোর উজানে ভারতের অবস্থান। ফলে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ।

অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাই কূটনৈতিক শক্তির ভিত্তি

এই বাস্তবতায় তারেক রহমান সরকার অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধান, রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে চাইছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংসতার বিচার নিশ্চিত করার দাবিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অতীতের অপরাধের বিচার হবে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সঙ্গে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে হবে। কোনো একটি আঞ্চলিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।

তারেক রহমানের জন্য তাই চ্যালেঞ্জটি কেবল সরকার পরিচালনার নয়; বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনার। প্রতিশোধের রাজনীতি এড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে পারলেই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে।