সেচের পানির সংকট, ডিজেলের বাড়তি দাম কিংবা বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা—কোনোটিই এখন আর আগের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না মীরসরাইয়ের কৃষকদের জন্য। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পাতকুয়া থেকে পানি তুলে জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পতিত জমি চাষের আওতায় আসছে, অন্যদিকে কমছে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়। সৌরবিদ্যুৎচালিত এই প্রযুক্তি স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) মীরসরাই উপজেলায় ছয়টি ডাগওয়েল (Dugwell) বা সৌরবিদ্যুৎচালিত পাতকুয়া স্থাপন করেছে। ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব পাতকুয়া নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে করেরহাট ইউনিয়নে চারটি এবং উপজেলার অন্যান্য এলাকায় দুটি স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমিতে সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ নেই, সেসব স্থানে সৌরশক্তি ব্যবহার করে সহজেই পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রচলিত সেচব্যবস্থার তুলনায় কম খরচে কৃষিকাজ পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন কৃষকরা।
এই ব্যবস্থায় সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সেই বিদ্যুতের সাহায্যে পাম্প চালিয়ে পাতকুয়া থেকে পানি তুলে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয়। এতে ডিজেল বা অন্য কোনো জ্বালানি কেনার প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেচকাজ বন্ধ থাকার আশঙ্কাও কমে যায়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এসব পাতকুয়া স্থাপনের ফলে পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি পড়ে থাকা জমিতেও এখন ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে পূর্ব অলিনগর গ্রামে পাতকুয়া স্থাপনের আগে পানির অভাবে জমিগুলোতে চাষাবাদ করা যেত না। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় ২০ একর জমি অনাবাদি অবস্থা থেকে চাষের আওতায় এসেছে। শুষ্ক মৌসুমেও এসব জমিতে ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো। এর ফলে জ্বালানি পোড়ানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ তৈরি হচ্ছে।
আগে সেচের জন্য কৃষকদের ডিজেলচালিত পাম্প কিংবা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হতো। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম এবং পাম্প পরিচালনার বাড়তি ব্যয় কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পানির উৎস দূরে হওয়ায় সেচের পানি সংগ্রহ করতেও অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। এসব সমস্যার বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎচালিত ডাগওয়েল কৃষকদের কাছে কার্যকর একটি ব্যবস্থা হয়ে উঠছে।
কৃষক নুর হোসেন মিয়া জানান, আগে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে তাঁর প্রায় পাঁচ বিঘা জমি পতিত পড়ে থাকত। পাতকুয়া স্থাপনের পর সেচের পানির সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। এখন সেখানে ধানের বীজতলা তৈরির পাশাপাশি বোরো ও আমন ধানের চাষ করছেন তিনি। এ ছাড়া বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, লাউ, মরিচ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, টমেটো ও আলুসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনেও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন।
আরেক কৃষক আবুল কাশেম বলেন, সৌরশক্তির মাধ্যমে পাতকুয়ার পাম্প পরিচালিত হওয়ায় বিদ্যুৎ কিংবা ডিজেলের প্রয়োজন হচ্ছে না। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি উত্তোলন করা যায় বলে কৃষকদের জন্য এটি বেশ সুবিধাজনক।
কৃষক মো. ইসরাফিলের মতে, সেচের খরচ কমাতে পাতকুয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে পানি দিতে কৃষকদের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ কৃষি উৎপাদনের জন্য সেচ অপরিহার্য। তিনি বলেন, পাতকুয়ার মাধ্যমে মাত্র ১০০ টাকায় জমিতে সেচের পানি দিতে পারছেন।
বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার কৃষিকে আধুনিকায়ন, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব করতে ডাগওয়েল স্থাপন একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। মীরসরাইয়ে এ পর্যন্ত ছয়টি ডাগওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এসব পাতকুয়ার পানি ব্যবহার করে ধান, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল চাষ করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, মীরসরাইয়ের পাহাড়ি বালিমাটি এবং পানির স্তর ডাগওয়েল স্থাপনের জন্য বেশ উপযোগী। এ ব্যবস্থায় পানি ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ স্তরের মধ্যবর্তী সাব-সারফেস স্তর থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাঁর ভাষ্য, এ স্তরের পানি ব্যবহারে পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি হয় না।
বিএডিসির এই কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি ডাগওয়েল নির্মাণে সরকারের প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়। স্থাপনের পর কৃষকরা নিজেরাই কমিটি গঠন করে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ফলে পরবর্তী সময়ে এসব পাতকুয়া পরিচালনা ও দেখভালের জন্য সরকার কিংবা বিএডিসিকে আলাদা কোনো ব্যয় বহন করতে হয় না।



