tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়ফের এলপিজির দাম বাড়ানোর তোড়জোড়

ফের এলপিজির দাম বাড়ানোর তোড়জোড়

দেশের এলপিজি বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে আবারও দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বাজারে এলপিজি বিক্রি হলেও আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবির মুখে নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিনব্যাপী গণশুনানি করেছে কমিশন।

গণশুনানিতে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিইআরসির কারিগরি কমিটি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশ কার্যকর হলে বর্তমানে নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা।

এর আগে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। তবে কমিশনের নির্ধারিত মূল্য উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ফলে সরকারি দরের তুলনায় প্রতিটি সিলিন্ডারে ভোক্তাদের অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজারে বিদ্যমান অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য কমিশনের হাতে ৬০ দিন সময় থাকলেও সংশ্লিষ্টদের আগামী রোববারের মধ্যে মতামত জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুনানির পর মতামত দেওয়ার জন্য কার্যত মাত্র এক কার্যদিবস সময় রাখা হয়েছে। এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে গত ১৪ অক্টোবর শুনানির ঘোষণা দিয়েছিল বিইআরসি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) অভিযোগ, বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে কমিশন তড়িঘড়ি করে দাম বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে।

নভেম্বর মাসে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের কারণেও এলপিজির দাম বাড়তে পারে। বিইআরসি ও আমদানিকারক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত সমন্বয়েই ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকার বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত কমিশন যুক্ত হলে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে।

তবে গণশুনানিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ কমিশনের কাছে নিয়মিত আসে। তবে কোনো কোনো সময় নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। ২০২১ সালে কমিশন ও অন্যান্য খরচের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমানে কোম্পানিগুলো প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে মজুত ও বোতলজাতকরণের খরচ বা কমিশন হিসেবে ২০০ টাকা পেয়ে থাকে। তবে এই কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেলটা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা কমিশন নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।

এ ছাড়া পরিবেশকেরা প্রতি সিলিন্ডারে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব এসেছে।

ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিইআরসির কারিগরি কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশক পর্যায়ে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা হিসাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ১৩৯ টাকা মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, যৌক্তিক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ না করলে এলপিজি বাজারের অস্থিরতা দূর করা সম্ভব হবে না। তাদের ভাষ্য, কমিশন বাড়ানোর দাবি নতুন নয়; গত দুই বছর ধরে এ বিষয়ে বিইআরসিকে জানানো হচ্ছে। এমনকি প্রায় এক বছর আগেই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির চাপে পড়ে কমিশন এখন শুনানির আয়োজন করেছে।

আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে প্রতি সিলিন্ডারে ১০০ টাকা, পরিবেশকদের জন্য ৭০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ১০৫ টাকা কমিশন বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সিলিন্ডারপ্রতি মোট ২৭৫ টাকা দাম বাড়বে। তাদের দাবি, এভাবে কমিশন সমন্বয় করা হলে বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রবণতা বন্ধ হবে।

তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানিতে আমদানিকারক ও বিইআরসিকে তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। ভোক্তাদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়া এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা না থাকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কয়েকজনও আমদানিকারকদের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পরিবেশকদের পক্ষে আবু তাহের কোরেশি বলেন, বোতলজাত করা এলপিজি পরিবেশকদের গুদাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমদানিকারক বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। কিন্তু বাজারে সংকট দেখা দিলেই তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে পরিবেশকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় এবং নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে শুনানিতে অংশ নিয়ে সৈয়দ মিজানুর রহমান নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি বিক্রি, অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদ জানান। এসব বিষয়ে কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে তিনি শুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন।

উল্লেখ্য, দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। বর্তমানে এক কোটিরও বেশি গ্রাহক এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ থাকলেও বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

এ অবস্থায় নতুন করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় আরও বাড়াবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরবরাহ সংকট, অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং বাজার তদারকির দুর্বলতার মধ্যে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এলপিজি ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।