tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়পিএইচপির গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, সাইবার হামলার ঝুঁকিতে বাংলাদেশও

পিএইচপির গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, সাইবার হামলার ঝুঁকিতে বাংলাদেশও

পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় দুটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে আক্রমণকারীরা দূর থেকে সার্ভারে ক্ষতিকর কোড চালানো কিংবা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ঝুঁকি এড়াতে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশের সরকারি ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি ওয়েবসাইটও সম্ভাব্য ঝুঁকিতে থাকায় দ্রুত নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সার্ভারগুলোতে পিএইচপির কোন সংস্করণ চলছে, তা শনাক্ত করা প্রয়োজন। এরপর সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্যাচ ইনস্টল করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশ বা সন্দেহজনক কার্যক্রমের কোনো চিহ্ন রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হোস্টিং ডটকমের বাংলাদেশের অপারেশন ম্যানেজার ইমরান হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পিএইচপির এই নিরাপত্তা দুর্বলতাকে অবহেলা করা উচিত হবে না। দেশের যেসব সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সেবা পিএইচপিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো দ্রুত পরীক্ষা করা দরকার। সার্ভারে ব্যবহৃত সংস্করণ যাচাইয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ এবং লগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করতে হবে। শুধু ফায়ারওয়াল বা পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ ও সার্ভার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিজিডি ই-গভ সার্টের সতর্কতা

বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টও এ বিষয়ে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে তাদের সার্ভার ও সিস্টেমে কোথায় কোথায় পিএইচপি ব্যবহৃত হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যবহৃত পিএইচপি সংস্করণগুলো নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে কি না, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সংস্করণ ও অপারেটিং সিস্টেমের উপযোগী হালনাগাদ ইনস্টল করতে হবে। শুধু আপডেট ইনস্টল করলেই চলবে না; ওয়েবসাইটের অনুরোধ প্রক্রিয়াকরণে বাস্তবে যে পিএইচপি রানটাইম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানেও সংশোধন কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে ইন্টারনেট থেকে প্রবেশাধিকার সীমিত করা, নির্দিষ্ট আইপি ঠিকানা থেকে সংযোগের অনুমতি দেওয়া এবং অননুমোদিত সংযোগের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

মেমোরি ব্যবস্থাপনায় দুটি ত্রুটি

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার (২১ অক্টোবর) পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য প্রকাশ করা হয়। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডব্লিউআইজেডের গবেষকেরা ত্রুটি দুটি শনাক্ত করেন। এগুলো সার্ভারের মেমোরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রথম দুর্বলতাটি কাজে লাগিয়ে সার্ভারের মেমোরিতে থাকা তথ্য অননুমোদিতভাবে পড়া কিংবা মেমোরির স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানো সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয় ত্রুটির মাধ্যমে সার্ভারে অনুমতি ছাড়া ক্ষতিকর কোড চালানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে আক্রান্ত সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য চুরি হওয়া থেকে শুরু করে অনলাইন সেবার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগানো হলে ওয়েবসাইটের তথ্য, ব্যবহারকারীর উপাত্ত এবং সার্ভারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্করণগুলোর জন্য প্রকাশিত নিরাপত্তা সংশোধন দ্রুত প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের কোটি কোটি ওয়েবসাইটে পিএইচপি

পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত সার্ভার-সাইড প্রোগ্রামিং ভাষা। সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নানা ধরনের অনলাইন সেবা পরিচালনায় এটি ব্যবহৃত হয়। প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিল্টউইথের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ সক্রিয় ওয়েবসাইট পিএইচপির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, ডব্লিউথ্রিটেকসের হিসাব বলছে, যেসব ওয়েবসাইটের সার্ভার-সাইড প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তার প্রায় ৬৯ শতাংশে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়।

ওয়েবসাইটের পেছনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় ভাষাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবহারকারীর ইনপুট প্রক্রিয়াকরণ, ডেটাবেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ, লগইন যাচাই, অনলাইন ফরম পরিচালনা এবং ওয়েবপেজে পরিবর্তনশীল তথ্য প্রদর্শনের মতো কাজে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ওয়ার্ডপ্রেসও এই ভাষার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সহজে শেখা এবং ওয়েবসাইটের বিভিন্ন অংশ ও ডেটাবেজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুবিধার কারণে একসময় ওয়েবসাইট তৈরিতে পিএইচপি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফলে দেশের অনেক ওয়েবসাইট ও হোস্টিং সেবায় এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দ্রুত প্যাচ প্রয়োগের পরামর্শ হোস্টিং প্রতিষ্ঠানের

বেসরকারি হোস্টিং প্রতিষ্ঠান লিমডা হোস্টের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) জুনাইদ মিয়াজী যুগান্তরকে বলেন, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পিএইচপিভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর সার্ভারে ব্যবহৃত সংস্করণ যাচাই করে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হোস্টিং সেবাদাতাদের সার্ভারের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তে সক্রিয় থাকতে হবে। সময়মতো নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ করা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তিনি আরও জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের প্রায় ৮০ শতাংশ ওয়েবসাইট পিএইচপিভিত্তিক। নিরাপত্তা ত্রুটির খবর পাওয়ার পর তাঁরা দ্রুত সার্ভারে সংশোধিত প্যাচ প্রয়োগ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য সাইবার হামলা ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী এবং হোস্টিং সেবাদাতাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ, সার্ভারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অননুমোদিত প্রবেশের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করাই এ মুহূর্তে ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।